Skip to main content

হযরত উসমান (রা)

উসমান ইবন আফ্‌ফান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিনঅনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
ʿউসমান ইবন আফ্‌ফান
عثمان بن عفان
দুই নূরের অধিকারী (জিন্নুরাইন) (ذو النورين)
“আল-গনি” (উদার)
আমির আল-মুমিনুন
Rashidun Caliph Uthman ibn Affan - عثمان بن عفان ثالث الخلفاء الراشدين.svg
খুলাফায়ে রাশেদিন এর ৩য় খলিফা
রাজত্ব৬ নভেম্বর ৬৪৪ – ১৭ জুন ৬৫৬
পূর্বসূরিউমর ইবনুল খাত্তাব
উত্তরসূরিআলী ইবনে আবু তালিব
জন্ম৫৭৬ খ্রিঃ (৪৭ হিজরি )
তায়েফআল আরব
মৃত্যু১৭ জুন ৬৫৬ খ্রিঃ(১৮ জিল্ -হাজ ৩৫ হিজরি)[১][২][৩] (৭৯ বছর)
মদিনাআল আরবখুলাফায়ে রাশেদিন এর রাজত্বকালে
সমাধিজান্নাতুল বাকিমদিনা
দাম্পত্য সঙ্গী
পূর্ণ নাম
উসমান ইবন আফ্‌ফান আরবিعثمان بن عفان‎‎
বংশ!কুুরাইশ (বনু উমাইয়া)
পিতাআফ্‌ফান ইবন আবি আল-আস্
মাতাআরওরা বিনতু কুরাইজ
উসমান ইবন আফ্‌ফান (عثمان بن عفان) (c. ৫৮০ - জুন ১৭ ৬৫৬) ছিলেন ইসলামের তৃতীয় খলিফা। ৬৪৪ থেকে ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত খিলাফতে অধিষ্ঠিত ছিলেন। খলিফা হিসেবে তিনি চারজন খুলাফায়ে রাশিদুনের একজন। উসমান আস-সাবিকুনাল আওয়ালুনের (প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারী) অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও তিনি আশারায়ে মুবাশ্‌শারা'র একজন এবং সেই ৬ জন সাহাবীর মধ্যে অন্যতম যাদের উপর মুহাম্মদ (সা.) সন্তুষ্ট ছিলেন।[৪]। তাঁকে সাধারণত হযরত উসমান (রা.) হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

জীবনী[সম্পাদনা]

জন্ম[সম্পাদনা]

উসমানের জন্ম সন ও তারিখ নিয়ে বেশ মতপার্থক্য রয়েছে। অধিকাংশের মতে তার জন্ম ৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে অর্থাৎ হস্তীসনের ছয় বছর পর[৫]। এ হিসেবে তিনি হযরত মুহাম্মদ (সা.) থেকে ছয় বছরের ছোট। অধিকাংশ বর্ণনামতেই তাঁর জন্ম সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে। অবশ্য অনেকের বর্ণনামতে তাঁর জন্ম তায়েফ নগরীতে বলা হয়েছে।[৬]ডেভিড স্যামুয়েল মার্‌গোলিউথ২০তম শতাব্দীর একজন অমুসলিম ইসলামী চিন্তাবিদ লিখেছেন :
নবীর থেকে ছয় বছরের ছোট উসমান একজন কাপড়ের ব্যবসায়ী ছিলেন; এছাড়াও তিনি মহাজনের ব্যবসা করতেন, অর্থাৎ বিভিন্ন উদ্যোগে অর্থ বিনিয়োগ করতেন যার লভ্যাংশের অর্ধেক তিনি পেতেন (ইবন সা'দ, iii, ১১১) এবং অর্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তিনি ছিলেন অতি সূক্ষ্ণ (আল-ওয়াকিদি ডব্লিউ.২৩১)। [৭]

পরিবার ও বংশ[সম্পাদনা]

উসমানের কুনিয়া আবু আমর, আবু আবদিল্লাহ, আবু লায়লা। তাঁর উপাধি জুন-নুরাইন এবং জুল-হিজরাতাইন। তার পিতা আফ্‌ফান এবং মাতা আরওরা বিনতু কুরাইজ। তিনি কুরাইশ বংশের উমাইয়্যা শাখার সন্তান ছিলেন। তার ঊর্ধ্ব পুরুষ আবদে মান্নাফে গিয়ে মুহাম্মদের (সা.) বংশের সাথে মিলিত হয়েছে। তার নানী বায়দা বিনতু আবদিল মুত্তালিব ছিলেন মুহাম্মদের ফুফু।
ইসলাম গ্রহণের পর মুহাম্মদ (সা.) তাঁর কন্যা রুকাইয়্যার সাথে তাঁর বিয়ে দেন। হিজরি দ্বিতীয় সনে তাবুক যুদ্ধের পরপর মদিনায় রুকাইয়্যা মারা যায়। এরপর নবী তাঁর দ্বিতীয় কন্যা উম্মু কুলসুমের সাথে তাঁর বিয়ে দেন। এ কারণেই তিনি মুসলিমদের কাছে জুন-নুরাইন বা দুই জ্যোতির অধিকারী হিসেবে খ্যাত। তবে এ নিয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে। যেমন ইমাম সুয়ুতি মনে করেন ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই ওসমানের সাথে রুকাইয়্যার বিয়ে হয়েছিল[৪]। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তা এই ধারণা পরিত্যাগ করেছেন। উসমান এবং রুকাইয়্যা ছিলেন প্রথম হিজরতকারী মুসলিম পরিবার। তারা প্রথম আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন। সেখানে তাদের একটি ছেলে জন্ম নেয় যার নাম রাখা হয় আবদুল্লাহ ইবন উসমান। এরপর উসমানের কুনিয়া হয় ইবী আবদিল্লাহ। হিজরি ৪র্থ সনে আবদুল্লাহ মারা যায়। তাবুক যুদ্ধের পরপর রুকাইয়্যা মারা যান। এরপর উসমানের সাথে উম্মু কুলসুমের বিয়ে হয় যদিও তাদের ঘরে কোনো সন্তান আসে নি। হিজরি নবম সনে উম্মু কুলসুমও মারা যান।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

প্রাথমিক জীবন[সম্পাদনা]

অন্যান্য অনেক সাহাবীর মতোই ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উসমানের জীবন সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় নি। উসমান কুরাইশ বংশের অন্যতম বিখ্যাত কোষ্ঠীবিদ্যা বিশারদ ছিলেন। কুরাইশদের প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে তার অগাধ জ্ঞান ছিল। ইসলাম গ্রহণের পূর্বেও তার এমন বিশেষ কোনো অভ্যাস ছিল না যা ইসলামী নীতিতে ঘৃণিত। যৌবনকালে তিনি অন্যান্য অভিজাত কুরাইশদের মতো ব্যবসায় শুরু করেন। ব্যবসায়ে তাঁর সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। মক্কার সমাজে একজন ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন বলেই তাঁর উপাধি হয়েছিল গনি যার অর্ধ ধনী।
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে অর্থাৎ যৌবনকালে উসমান মুনাফাভিত্তিক এবং লাভজনক লেনদেনের মাধ্যমে অনেক টাকার মালিক হন।[৮]

মক্কায় থাকাকালীন অবস্থায়[সম্পাদনা]

ইসলাম গ্রহণ[সম্পাদনা]

৬১১ সালে তিনি সিরিয়া থেকে বানিজ্য করে ফিরে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইসলাম প্রচার সম্পর্কে জানতে পারে এবং আবু বকরের মাধম্যে রাসুলুল্লাহর কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি প্রথম দিকের ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম।[৯]

হিজরতের পর মদীনায় থাকাকালীন অবস্থায়[সম্পাদনা]

মৃত্যু[সম্পাদনা]

হযরত ওসমান রাঃ কে কুরঅান তেলওয়াত করা অবস্হায় শহীদ করা হয়।

খিলাফতের দায়িত্ব লাভ ও অবদান[সম্পাদনা]

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রশাসন[সম্পাদনা]


বিসমিল্লাহ লিখিত পারস্য মুদ্রা।


হযরত উমার (রা) মৃত্যুবরণ করবার সময় একটা করুণ আর হুলস্থূল সংকটের মুখে ছিল মুসলিম বিশ্ব। সেই সময় যিনি এর হাল ধরেন তিনি হযরত উসমান জুন্নুরাইন (রা)। সাহাবীদের মধ্যে ধনীতম এ মহান মানুষটি ইসলামের প্রাথমিক যুগে এত দান করে গিয়েছিলেন যে ইসলামি ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে সেসব কাহিনী। কিন্তু তবুও ভর দুপুরে দুষ্কৃতিদের এতটুকু হাত কাঁপেনি তাঁকে তাঁর স্ত্রীদের সরিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করতে। আজকের প্রবন্ধে আমরা রোর বাংলার পাঠকদের জন্য তুলে ধরব খলিফা হযরত উসমান (রা) এর শাসনামল আর কী পরিস্থিতির কারণে তাঁকে এই করুণ মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল।
ক্যালিগ্রাফিতে উসমান (রা) এর নাম। ছবিসূত্রঃ ইউটিউব
পূর্ববর্তী খলিফা হযরত উমার (রা) এর মৃত্যুর কারণ পাঠকরা নিশ্চয়ই জেনে থাকবেন আমাদের পূর্বের পোস্ট থেকে। মৃত্যুশয্যায় তিনি ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করলেন যাদের মধ্য থেকে খলিফা নির্বাচিত হবে। তারা ছিলেন হযরত আলী (রা), হযরত উসমান (রা), আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা), সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা), আল-জুবাইর (রা) ও তালহা (রা)। তাঁর মৃত্যুর তিন দিনের মাথায় যেন তারা খলিফা নির্বাচিত করেন এমনটাই বলে যান উমার (রা)। তিনি তাদের জিজ্ঞেসও করলেন তারা কাকে ভোট দেবেন। আলী (রা) কোনো উত্তর না দিলেও উসমান (রা) জানালেন তিনি আলী (রা)-কে ভোট দেবেন। জুবাইর (রা) বললেন তিনি আলী (রা) বা উসমান (রা)-কে ভোট দেবেন। আর সাদ (রা) বললেন তিনিও উসমান (রা)-কে দেবেন।
এটা অবাক করা বিষয় ছিল না কারো কাছে যখন পরবর্তী খলিফা নির্বাচিত হলেন হযরত উসমান (রা)। তিনিও কুরাইশ বংশেরই মানুষ; কিন্তু নবীর গোত্রের নয়, বরং মক্কার সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ধনী গোত্র উমাইয়াদের মাঝে তাঁর জন্ম। পিতার বিশাল সম্পত্তির উত্তরাধিকার তিনি পেয়েছিলেন। মক্কা বিজয়ের কিছু আগ পর্যন্ত এই উমাইয়ারা রাসুল (সা) এর চরম বিরোধী ছিল। কিন্তু তাদের মাঝে উসমান (রা) তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবু বকর (রা) এর পরামর্শে প্রথম দিকেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। মক্কার ধনী ব্যবসায়ী উসমান (রা) তাঁর সম্পদের বিশাল অংশ ইসলামের জন্য দিয়ে দেন। আবিসিনিয়াতে যখন তিনি সপরিবারে হিজরত করেছিলেন, তখন সেখানেও তিনি ব্যবসাতে সফল হন। আবার যখন মদিনার মতো কৃষিজীবী অঞ্চলে এলেন, সেখানে ইহুদী ব্যবসায়ীদের মাঝে একমাত্র মুসলিম ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠেছিল। আর এই বিশাল ধনসম্পদ সর্বদা তিনি ব্যয় করেন ইসলামের স্বার্থেই।
খলিফা নির্বাচিত হবার পর তিনি রাজকোষ থেকে কোনো বেতন নিতেন না। কারণ তাঁর নিজেরই যথেষ্ট অর্থ ছিল, আর কোনো অর্থ তাঁর দরকার পড়ত না। তবে মানুষের দেয়া উপহার তিনি সাদরে গ্রহণ করতেন, যেমনটা করতেন নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)।
উসমান (রা) এর স্ত্রী ছিলেন হযরত রুকাইয়া (রা) যিনি ছিলেন নবী (সা) এর কন্যা। কিন্তু তিনি যখন মারা যান, তখন নবী (সা) তাঁর আরেক কন্যা উম্ম কুলসুম (রা)-কেও উসমান (রা) এর কাছে বিয়ে দেন, এতটাই পছন্দ করতেন তিনি উসমান (রা)-কে। নবী বংশের দুজন আলো তাঁর স্ত্রী হয়ে ঘরে আসে। এজন্য উসমান (রা) এর এক উপাধি ছিল ‘জুন্নুরাইন’ যার অর্থ ‘দুই আলোর অধিকারী’। তিনি যেদিন খলিফা হন সেদিন ছিল ৬৪৪ সালের ৬ নভেম্বর। এ শাসনকাল চলেছিল ৬৫৬ সালের ১৭ জুন পর্যন্ত। চলুন আমরা সংক্ষেপে জেনে নেই কেমন গিয়েছিল তাঁর শাসনকাল।
পাঠকদের হয়ত মনে আছে, হযরত উমার (রা) এর পুত্র উবাইদুল্লাহ ক্রোধ আর প্রতিশোধের বশে হত্যা করেন হরমুজান, জাফ্রিনা ও ফিরোজের কন্যা আর স্ত্রীকে। উমার (রা) দায়িত্ব দিয়ে যান পরবর্তী খলিফাকে কারাবন্দী উবাইদুল্লাহ-র ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে। এটাই ছিল উসমান (রা) এর প্রথম মামলা ক্ষমতা গ্রহণের পর।
আবু বকর (রা) এর পুত্র আব্দুর রহমান ছাড়া আর কেউ বিশ্বাস করতেন না যে কোনো পারস্য ষড়যন্ত্র ছিল এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে। কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি। তাই এ চারজন নিরপরাধ নাগরিক হত্যার দায়ে উমার (রা) এর পুত্র উবাইদুল্লাহ-কে হয় মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে, নয়ত যদি মৃতের আত্মীয় রাজি থাকে তবে ব্লাডমানি প্রদান করতে হবে।
আলী (রা) বললেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অবশ্যই মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। কিন্তু আমর ইবনে আস (রা) বললেন, আগের দিন আমরা উমার (রা)-কে হারিয়েছি, আর আজ হারাবো তাঁর পুত্রকে? উমার (রা) এর প্রতি সম্মান রেখে দ্বিতীয় অপশন বেছে নেয়া উচিৎ।
তাবারীর বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি, নিহত হরমুজানের পুত্র ক্বামাজবান সাক্ষী হিসেবে খলিফার কাঠগড়ায় দাঁড়ান। তাঁর সাক্ষী থেকে বোঝা যায় হরমুজান ছিলেন নির্দোষ। ফিরোজ একাই এ কাজ করেছে, এর সাথে মদিনার আর কেউ জড়িত ছিল না। ক্বামাজবান প্রথমে উবাইদুল্লাহ-র মৃত্যু চাইলেন। কিন্তু পরে তিনি মত পরিবর্তন করলেন এবং আল্লাহ্‌র ওয়াস্তে তাঁকে ক্ষমা করে দিলেন।
উবাইদুল্লাহ-কে যখন উসমান ব্লাডমানি পরিশোধ করতে বললেন, তখন দেখা গেল তাঁর কাছে টাকা নেই। তখন উসমান (রা) নিজের পকেট থেকে পুরো টাকা পরিশোধ করেন; প্রত্যেক নিহতের জন্য এক হাজার দিনার করে, যেমনটা তখন নির্ধারিত ছিল।
উসমান (রা) এর শাসনামলকে আমরা চার ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথমে আমরা কথা বলব তাঁর আর্থসামাজিক অবদান, এরপর আসবে সামরিক অভিযানগুলো, এরপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কারণে তাঁকে স্মরণ করা হয় সেই কুরআন সংকলন আর সবশেষে আসবে যে ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি নিহত হন।
প্রথমেই আসা যাক আর্থসামাজিক অবদানে। উসমান (রা) ক্ষমতা নেবার পর জনগণের ভাতা ২৫% বৃদ্ধি করে দেন আগের তুলনায়। যেসব জায়গা বিজিত হবে, সেখানে জমি কেনাবেচা নিষিদ্ধ করেছিলেন উমার (রা)। এ নিষেধাজ্ঞা উসমান (রা) তুলে নেন এবং ব্যবসার সুযোগ বাড়িয়ে দেন। তাঁর আমলে অসাধারণ রকমের ভালো ছিল ইসলামি বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং জনগণ সমৃদ্ধিতে ছিল।
এরপর আমরা এখন আসি উসমান (রা) এর শাসনামলের সামরিক পরিস্থিতির দিকে। যে দিক দিয়ে উসমান (রা) সমালোচিত হয়েছিলেন সবচেয়ে বেশি সেটি ছিল তাঁর স্বজনপ্রীতি। তিনি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়োগ দিয়েছিলেন প্রধানত তাঁর উমাইয়া গোত্রীয় আত্মীয়দের। এমন না যে, যাদের নিয়োগ দিয়েছিলেন তারা একদমই সক্ষম কেউ ছিলেন না। তবুও এ দিক দিয়ে নিরপেক্ষতা বজায় না রাখবার জন্য ব্যাপারটা অনেকেই ভালোভাবে নেননি। অবশ্য, পরবর্তীতে কিছু কিছু ইতিহাসবিদ উসমান (রা) এর নিয়োগ দেওয়া মানুষদের ব্যাপারে দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন।
হযরত আবু বকর (রা) সাহাবী ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ানকে রোমান সিরিয়া আক্রমণে প্রেরণ করেছিলেন। পরে তিনি দামেস্কের গভর্নর হন। পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে, উমার (রা) এর সময় একটি ভয়াবহ প্লেগ হয়েছিল। সেই প্লেগে সিরিয়ার আবু উবাইদা (রা) মারা যান। এরপর মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা)-কে প্রেরণ করা হয় গভর্নর হিসেবে। তিনিও এ প্লেগে মারা যান। এরপর উমার (রা) ইয়াজিদ বিন আবু সুফিয়ানকে প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনিও প্লেগে মারা যান। এরপর উমার (রা) সিরিয়ার গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করেন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানকে। উল্লেখ্য, মুয়াবিয়া ছিলেন উসমান (রা) এর চাচাতো ভাই। উসমান (রা) এর শাসনামলে মুয়াবিয়া বিশাল এক মুসলিম নৌবাহিনী গড়ে তোলেন এবং সেই বাহিনীতে মুসলিম ছাড়াও মিসরীয় ও সিরীয় খ্রিস্টানরা যোগদান করেন। এই যুগান্তকারী নৌবাহিনী ৬৫৫ সালে দুর্দান্ত রোমান বাইজান্টিন নৌবাহিনীকে ভূমধ্যসাগরে পরাস্ত করে। এতে মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রসারে নতুন এক পালক যুক্ত হয়। আর বাইজান্টিন সাম্রাজ্যের বিদায়ঘণ্টা বেজে ওঠে।
৬৫১ সালে উসমান (রা) আব্দুল্লাহ ইবন জুবাইর ও আব্দুল্লাহ ইবনে সাদকে প্রেরণ করেন মাগ্রেবে। সেখানে রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াসের আত্মীয় গ্রেগরির প্রায় ১ বা ২ লাখ সেনাসম্পন্ন বাহিনীর মুখোমুখি হয় মুসলিম বাহিনী। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ইতিহাসগ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি, এই বিশাল বাহিনী মুসলিমদেরকে চারপাশ থেকে বৃত্তাকারে ঘিরে ফেলে, একদম পুরো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায় মুসলিম বাহিনী। তখন ইবন জুবাইর দেখতে পেলেন ঘোড়ার গাড়ির উপর গ্রেগরি বসে আছেন, তখন ইবনে সা’দকে তিনি ওদিকে যেতে বলেন। একটা ছোট গ্রুপ তখন ইবনে সা’দের নেতৃত্বে ঝাঁপিয়ে পড়ে গ্রেগরির উপর। গ্রেগরি মারা যেতেই বাইজান্টিন বাহিনীর মনোবল ভেঙে যায় এবং তারা পরাজিত হয়ে প্রস্থান করে।
উমার (রা) এর আমলে যেখানে সব সেনা অভিযান উমার (রা) এর নিজস্ব কমান্ডে হতো, উসমান (রা) এর সময় তা ছিল না। বরং তিনি স্বাধীনতা দিয়েছিলেন কমান্ডারদের নিজস্ব স্টাইলে অভিযান এগিয়ে নিয়ে যাবার। এভাবে ইবনে সা’দ এর নেতৃত্বে উত্তর আফ্রিকা এবং ইস্পাহান বা স্পেনের কিছু অংশ জয় করে নেন। স্পেনের আন্দালুসে তারা অভিযান চালিয়েছিলেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিক অবশ্য বলে থাকেন, ৭১১ সালের আগে এমনটা হয়নি।
উসমান (রা) এর আমলে ইসলামি বিশ্ব। ছবিসূত্রঃ Wikimedia Commons
ওদিকে আহনাফ ইবনে কায়েস (যিনি কিনা হরমুজানের বাহিনীকে শুস্থারে পরাজিত করেছিলেন উমার (রা) এর সময়) তুর্কমেনিস্তান, ফার্স, কারমান, সিস্তান, খোরাসান (আফগানিস্তান) জয় করে নেন। অনেকের কাছে মনে হতে পারে, কেন এভাবে রাজ্য বিজয় করতে হবে? ব্যাপারটা একবিংশ শতকে এসে অবাক লাগলেও তখন স্বাভাবিক ছিল। কারণ একটা রাজ্য যদি সম্প্রসারিত না হয়ে ক্ষমতাবান না হয়, তবে পাশের রাজ্য ক’দিন বাদে ঠিকই এই ছোট দুর্বল রাজ্যকে ছিনিয়ে নেবে। ‘ডু অর ডাই’ নীতিতে তখন চলতো সারা বিশ্ব।
উসমান (রা) এর তরবারির রেপ্লিকা। ছবিসূত্রঃ MySabah
লেখার এ পর্যায়ে আমরা একটা বহুল প্রচলিত প্রশ্নের উত্তর দেব, “কেন উসমান (রা) কুরআনের অনেক কপি পুড়িয়ে ফেলেন?” পশ্চিমাবিশ্বের অনেকেই ধারণা করে থাকে, কুরআন পুড়িয়ে ফেলা একটি গর্হিত কাজ। আসলে তা নয়; ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী কুরআনের একটি ভুল কপি বা ব্যবহারের অযোগ্য কপি যদি আপনি ‘ডিস্পোজ’ করতে চান, অর্থাৎ অপসারণ করতে চান যেন সেটা আর ব্যবহার করা না হয়, তবে সেটা আপনাকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে হবে, কিংবা মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে, এরকম কিছু উপায়ে ‘ডিস্পোজ’ করতে হবে।
এ বিষয়টি স্কলারদের জানা থাকলেও, সাধারণ অনেক মুসলিমেরই জানা নেই (বিশেষ করে বাংলাদেশে) যে পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছিল সাতটি আহরুফে। বা সহজ করে বলতে গেলে সাতটি আরবি উপভাষায়, সাত রকমভাবে। যেমন, একবার উমার (রা) মসজিদে গিয়ে দেখলেন এক লোক সুরা ফুরকান তিলাওয়াত করছেন। উমার (রা) বুঝতে পারলেন লোকটি ফুরকান তিলাওয়াত করছেন। কিন্তু তারপরেও তিনি লক্ষ্য করলেন ঐ সাহাবী ভিন্নভাবে পড়ছেন; তাঁর কিছু কিছু শব্দ ভিন্ন, উচ্চারণ ভিন্ন। অথচ উমার (রা) জানতেন কুরআন এক ও অভিন্ন। তখন তিনি ঐ সাহাবীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন; জিজ্ঞেস করলেন, এই তিলাওয়াত তুমি কার কাছ থেকে শিখেছো? তিনি জবাব দিলেন, আমি তো রাসুল (সা) এর কাছ থেকেই শিখেছি। উমার (রা) বললেন, আমিও তো তাঁর থেকেই শিখেছি; চলো তাঁর কাছে। যখন তারা বিষয়টি নিয়ে রাসুল (সা) এর কাছে উপস্থিত হলেন, তখন রাসুল (সা) বললেন, তারা দুজনেই সঠিক। কুরআন সাত রকম আরবি উপভাষায় নাজিল হয়েছে।
বিশুদ্ধ হাদিস থেকে আমরা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রা) ও আবু হুরাইরা (রা) এর বর্ণনা থেকে পাই, রাসুল (সা) বলেছেন, কুরআন নাজিল হয়েছে সাতটি আহরুফে। এ বিষয়ে তর্ক করা অবিশ্বাস; তোমরা যতটুকু জানো সেটাতেই আমল করবে, আর যে অংশ জানো না সেটা যে জানে তার জন্য রেখে দাও। এ বিষয়ে বুখারি ও মুসলিম শরীফে অনেকগুলো হাদিস রয়েছে।
কুরআন যে যুগে নাজিল হয়েছিল সে যুগে অধিকাংশ আরব ছিল নিরক্ষর, তার উপর বেদুইনরা তো ছিলই। যে কুরাইশি উপভাষায় কুরআন নাজিল হতো সে উপভাষায় দূর দূরান্তের বেদুইনরা কথা বলত না, তাদের ভঙ্গিমা ছিল ভিন্ন। সুতরাং এ আরবি তাদের জন্য কঠিন হতো। অথচ কুরআন আরবিতে সহজ করে নাজিল হবার কথা। বুখারি ও মুসলিম শরিফের হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি, তখন নবী মুহাম্মাদ (সা) জিবরাঈল (আ)-কে অনুরোধ করেন ভিন্ন উপভাষায় কুরআন আনয়নের। তখন ক্রমান্বয়ে জিবরাঈল (আ) একে একে সাতটি উপভাষায় কুরআনের আয়াতগুলো আনয়ন করেন। এ সাতটি উপভাষাতেই রাসুল (সা) ব্যক্তিভেদে শিক্ষা দেন। যেমন উমার (রা) কুরাইশের মানুষ, এজন্য তাঁর অন্যটা শিক্ষা করা হয়নি।
কিন্তু এমন ভাবার কোনো কারণ নেই যে, এই সাতটি ভার্শনে (ভার্সন শব্দের মানে এই নয় যে পুরো ভিন্ন এক একটা) অনেক পার্থক্য আছে। যদি তাই হতো তবে উমার (রা) বুঝতে পারতেন না যে ঐ সাহাবী সুরা ফুরকান তিলাওয়াত করছেন। কিন্তু বিষয়টি এত গোপনীয় ছিল যে উমার (রা) এর মতো বড় সাহাবীও প্রথম দিকে জানতেন না ব্যাপারটা। পার্থক্য ছিল সামান্য কিছু উচ্চারণে, আর কিছু শব্দের প্রতিশব্দ ব্যবহৃত হয়েছিল; অনেকটা ব্রিটিশ আর আমেরিকান ইংলিশের পার্থক্যের মতো। এক জায়গায় ফ্ল্যাট বললে আরেক জায়গায় এপার্টমেন্ট; এক জায়গায় এলিভেটর বললে আরেক জায়গায় এস্কেলেটর। তাঁর মানে কিন্তু এই না যে আমেরিকানরা ব্রিটিশ ইংলিশ বোঝেন না। তেমনই সকল আরবই সাত উপভাষার কুরআন বুঝতেন।
যা-ই হোক, নবী (সা) মারা যাবার প্রথম দু’বছরের মধ্যেই কুরাইশি ডায়ালেক্টে/উপভাষায় কুরআন এর প্রধান কপি বা মাস্টার কপি তৈরি করা হয়ে যায়, যা কালের বিবর্তনে হাফসা (রা) এর কাছে ছিল। কিন্তু ঐ যে বলছিলাম উপভাষার কথা। কুরাইশি, সাকিফি, হাওয়াজিনি, কিনানাই, তামিমি, হুজাইলি আর ইয়েমেনি- অন্তত এই সাত আরবি উপভাষায় কুরআন নাজিল হয়েছিল। কিন্তু প্রথম এবং নবী (সা) এর নিজের উপভাষাতে নাজিল হয়েছিল সেই কুরাইশি ভার্শনটিই এবং মাস্টারকপি ছিল সেটাই। যখন উসমান (রা) এর শাসন চলছে, তখন হযরত মুহাম্মাদ (সা) মারা যাবার অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। দূর দূরান্তে সাম্রাজ্য বিস্তার হয়ে গেছে। নতুন অনেকেই মুসলিম হয়ে গেছে। এমন না যে সকলে কুরাইশি উপভাষায় কথা বলে। তাই তারা তাদের পছন্দের ভার্শন বা আহরুফেই তিলাওয়াত করত। কিন্তু যেহেতু অনেকেই এই সাত ভার্শনের বৈধতার কথা জানতেন না, কেউ কেউ দাবি করতে লাগলেন তাদেরটা সঠিক, অন্যেরটা ভুল। আবার অনেকদিন পার হয়ে যাবার কারণে যারা নিজেরা নিজেদের উপভাষায় কুরআন লিখিয়ে নিচ্ছিলেন সেখানে ভুল ত্রুটি ধরা পড়ছিল, মানুষ মাত্রই ভুল করতে পারে। আবার অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহাবীও তাদের নিজেদের কপিতে দেখা যেতো, আয়াতের পাশে পাশে সাইডনোট লিখে রাখছিলেন, সেটা দেখে কেউ কেউ আবার সাইডনোটকেও কুরআনের আয়াতের অংশ ভেবে বসলে সমস্যা।
কুরআন নিয়ে এত মতবিভেদ দেখবার পর উসমান (রা) সিদ্ধান্ত নিলেন কেবল কুরাইশি মাস্টার কপি রেখে বাকিগুলো সরিয়ে ফেলবেন, যেন পুরো মুসলিম বিশ্ব জুড়ে কোনো তর্ক না থাকে এসব নিয়ে। অসংখ্য হাফিজ সাহাবী উপস্থিত থাকতেই যে কপি লিখিত হয়েছিল রাসুল (সা) এর নিজের মাতৃভাষায় সেটাই হবে আসল কপি। এজন্য তিনি আহ্বান করেন সকলে যেন অন্যান্য কপিগুলো দিয়ে যায়। সেগুলো শরিয়ত মোতাবেক তিনি পুড়িয়ে ফেলেন, এবং পুরো বিশ্ব জুড়ে এক ও অভিন্ন কুরাইশি আহরুফের কুরআন প্রচলিত করেন। সেই কপিটি তিনি অনেকগুলো কপি করিয়ে সকল প্রদেশে একটি করে পাঠিয়ে দেন। যার যার দরকার হবে সেই কপি থেকে যেন লিখিয়ে নেয়।
তবে কয়েকজন সাহাবী নিজের লেখা কুরআনের কপি হস্তান্তর করতে চাননি। না চাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কারণ এতদিন ধরে তিনি এটা পড়ে এসেছেন, এখন এটাকে বিদায় দিতে হবে- এটাতে খারাপ লাগবারই কথা। যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রা) ছিলেন এমন একজন, যিনি চাননি নিজের পাণ্ডুলিপি দিয়ে দিতে। তবে উসমান (রা)-কে তিনি ছোটোখাটো ব্যাপারেও খুব মান্য করতেন। তাই তাঁর সাথে এ ব্যাপারে বড় কোনো দ্বন্দ্ব হবার কাহিনীগুলো বানোয়াট বলেই মনে করেন সুন্নি স্কলাররা। কোনো কোনো সাহাবীর পাণ্ডুলিপিতে ১১৪টি সুরার চেয়ে কম সুরা ছিল। অর্থাৎ তারা সবগুলো সংগ্রহ করেননি বা লিখেননি। আবার যেমন উবাই ইবনে কা’ব (রা) অতিরিক্ত দুটো দুয়াকে তাঁর কুরআনের পাণ্ডুলিপির শেষে লিখে রেখেছিলেন। অনেকে ভুলবশত সেটা কুরআনের সুরা মনে করে থাকতে পারে। কিন্তু প্রচুর সংখ্যক কুরআনে হাফিজ থাকবার কারণে এসব ভুল পাত্তা পায়নি।
কুরাইশি আহরুফকেও যে অনেকে ভিন্নভাবে তিলাওয়াত করেননি তা নয়। এবার আর কোনো শব্দগত পার্থক্য ছিল না। পার্থক্য ছিল তিলাওয়াতে আর অ্যাক্সেন্টে। একে আমরা বলি কিরাত। মোটামুটি দশ রকম কিরাত পরবর্তীতে মানসম্পন্ন হিসেবে গ্রহণ করা হয়। হযরত উসমান (রা) চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন কুরআনকে ঠিকভাবে সংকলন করে মুসলিম জাতির ঐক্য ধরে রাখার কারণে। এ কারণে ১৪০০ বছর ধরে মুসলিমরা সেই কুরাইশি ম্যানুস্ক্রিপ্ট এক ও অভিন্নভাবে পড়ে আসছে নবী (সা) এর মাতৃভাষায়। স্কলারদের গবেষণার জন্য ভিন্নতাগুলো জন্য রেখে দেয়া আছে এবং সেটা উচ্চতর শিক্ষার বিষয়।হযরত ওসমান (রাঃ) এর শাহাদাত ও শাহাদাতের ফলাফল



আল্লাহর রসূল (সা) হযরত ওসমান (রা) সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেনসাধারণ মুসলমানগণ বিদ্রোহীদের ধ্বংসাত্মক অভিযানে মধ্যে অশ্রু নয়নে তাই দেখতেছিলেন। একমাত্র হযরত ওসমানই নির্বিকার চিত্তে আল্লাহর রাসূলের অন্তিম বাণীর বাস্তবতা অবলোকন করার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। জুমার দিন সুর্যোদয়ের পূর্বেই তিনি রোজার নিয়ত করলেন। এই দিন তিনি সকালের দিকে স্বপ্ন দেখলেনআল্লাহর রাসূল (সা) হযরত আবু বকর সিদ্দিক ও হযরত ওমর সমভিব্যহারে তাশরীফ এনে বলতেছেন- ওসমান (রা) শীঘ্র চলে আস। আমি এখানে তোমার ইফতারের অপেক্ষায় বসে আছি। চক্ষু খোলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিবিকে ডেকে বললেন,আমার শাহাদাতের সময় নিকটবর্তী হয়েছে। বিদ্রোহীরা এখনই আমাকে হত্যা করে ফেলবে। বিবি বলিলেন,- নানাএইরূপ কিছুতেই হতে পারে না। তিনি বলিলেনআমি এখনই স্বপ্নে দেখেছি। এই কথার পর বিছানা হতে উঠে একটি নূতন পাজামা পরিধান করলেন এবং কোরআন সম্মুখে নিয়ে তেলাওয়াতে বসে গেলেন।
ঐদিকে সেই সময় মোহাম্মদ ইবনে আবু বকর তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করলেন। একটি তীর এসে খলিফার দ্বারে দণ্ডায়মান হযরত হোসাইনের শরীরে বিদ্ধ হল। হযরত হোসাইন (রা) গুরুতররূপে আহত হলেন। আর একটি তীর গৃহের অভ্যন্তরে মারওয়ানেরশরীরে গিয়ে লাগল। হযরত আলীর গোলাম কাম্বরও মাথায় আঘাত প্রাপ্ত হন। হযরত হোসাইনকে আহত হতে দেখে মোহাম্মদ ইবনে আবু বকর ভীত হয়ে উঠেন। তিনি স্বীয় দুই সঙ্গীকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন- বনী হাশেম যদি হযরত হোসাইনের আহত হওয়ার খবর পায়তবে আমাদের সমগ্র পরিকল্পনা বানচাল হয়ে যাবে। তারা হযরত ওসমানের কথা ভুলে হযরত হোসাইনের রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ না করে ছাড়বে না। সুতরাং এই মুহূর্তে কার্য উদ্ধার করে ফেলা উচিত। মোহাম্মদ ইবনে আবু বকরের এই পরামর্শ মত সঙ্গে সঙ্গেই কয়েকজন বিদ্রোহী দেওয়াল টপকিয়ে গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল। ঘটনাচক্রে খলিফার ঘরে তখন যে কয়জন মুসলমান উপস্থিত ছিলেনসকলেই উপরে বসে অপেক্ষারত ছিলেন। হযরত ওসমান (রা) তখন একাকী নীচে বসে কোরআন তেলাওয়া্তে মশগুল ছিলেন। বিদ্রোহীদের সাথে গৃহে প্রবেশ করতঃ মোহাম্মদ ইবনে আবু বকর অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যবহার করলেন। তিনি হযরত ওসমানের পবিত্র দাড়ি আকর্ষণ করিয়া তাকে সজোরে মাটিতে ফেলে দিলেন। আমীরুল মোমেনীন ওসমান (রা) তখন বলতে লাগলেন- ভ্রাতুষ্পুত্রআজ হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) জীবিত থাকলে এই দৃশ্য কিছুতেই পছন্দ করতেন না। এই কথা শুনে মোহাম্মদ ইবনে আবু বকর অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে পিচু হটে গেলেনকিন্তু কেননা ইবনে বেশর একটি লোহার শলাকা দিয়া খলিফার মস্তকদেশে এক নিদারুণ আঘাত হানল। আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর রসূলের এই সম্মানিত প্রতিভূ বিছানায় গড়িয়ে পড়লেন এবং বলতে লাগলেনঃ বিসমিল্লাহআল্লাহর উপর ভরসা করিতেছি। দ্বিতীয় আঘাত করল সাওদান ইবনে আমরান। দ্বিতীয় আঘাতে রক্তের ফোয়ারা বহিয়া চলল। আমর ইবনে হোমকের নিকট এই নৃশংসতা যথেষ্ট মনে হল না। হতভাগ্য নায়েবে রাসূলের বুকের উপর আরোহণ করতঃ খড়গ দ্বারা আঘাতের পর আঘাত করতে শুরু করল। এই সময় অন্য এক নির্দয় তরবারি দ্বারা আঘাত করল। এই আঘাতের সময় বিবি হযরত নায়েলা দৌড়িয়ে ওসমান (রাঃ) কে দরতে গেলে তার তিনটি আঙ্গুল কেটে মাটিতে পড়ে গেল। এই ধস্তাধস্তির মধ্যেই আমীরুল মোমেনীনের পবিত্র আত্মা জড়দেহ ছেড়ে অনস্ত শূন্যে মিলিয়ে গেল। ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন।
নৃশংসতার এই পাশবিক দৃশ্য কেবলমাত্র হযরত নায়েলা সচক্ষে দর্শন করলেন। তিনি হযরত ওসমানকে নিহত হতে দেখে ঘরের ছাদে আরোহণ করতঃ চিৎকার করিয়া বলতে লাগলেনআমীরুল মোমেনীন শহীদ হয়ে গিয়েছেন। খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমীরুল মোমেনীনের বন্ধুরা ছুটে এসে দেখলেনহযরত ওসমানের রক্তাক্ত দেহ বিছানায় পড়ে রয়েছে। এই খবর প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মদীনাবাসীগণ ঊর্ধ্বশ্বাসে খলিফার গৃহের দিকে ছুটে আসলেনকিন্তু তখন সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। হযরত আলী (রা) কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে হযরত হাসান ও হোসাইনকে শাসন করতে লাগলেনকিন্তু সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। হযরত ওসমান (রা) রক্তের ফোয়ারায় ডুবে গৃহের অভ্যন্তরে পড়েছিলেনকিন্তু তখনও অবরোধ ঠিকমত চলছিল। দীর্ঘ দুই দিন পর্যন্ত খলিফাতুল মুসলেমনীনের পবিত্র লাশ গোর-কাফন ব্যতীত গৃহে পড়ে থাকে। তৃতীয় দিন কতিপয় ভাগ্যবান মুসলমান এই শহীদের রক্তাক্ত লাশ দাফন-কাফনের জন্য  এগিয়ে আসলেন। মাত্র সতের জন লোক জানাযার নামায পড়লেন। এইভাবে আল্লাহর কিতাবের সর্বশ্রেষ্ঠ সেবকসুন্নতে রাসূলের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেমিককে জান্নাতুল বাকীতে নিয়ে সমাহিত করা হয়
দুর্ঘটনার সময় ওসমান (রা) কোরআন তেলাওয়াত করতেছিলেন। তাঁহার সম্মুখে পবিত্র কোরআন খোলা অবস্থায় পড়েছিল। হযরত ওসমানের পবিত্র রক্ত কোরআন পাকের নিম্নলিখিত আয়াতখানা রঞ্জিত করে দিয়েছিলঃ
فسيقفيك الله - انه هو السميع العليمআল্লাহই তোমার জন্য যথেষ্ট। তিনি প্রাজ্ঞ. তিনি সব শোনেন।
জুমার দিন আছরের সময় তিনি শহীদ হলেন। হযরত জুবাইর ইবনে মোত্য়েম জানাযার নামায পড়ালেন। হযরত আলী (রা) দুই হাত ঊর্ধ্বে তুলে বলতে লাগলেনআমি ওসমানের রক্তপাত হতে সম্পূর্ণ নির্দোষ! সায়ীদ ইবনে যায়েদ (রা) বললেনতোমাদের ধৃষ্টতার প্রতিফলস্বরূপ ওহুদ পর্বত ফেটে পড়ার কথা। হযরত আনাস (রা) বললেনহযরত ওসমানের জীবদ্দশা পর্যন্ত আল্লাহর তরবারি কোষবদ্ধ ছিল। তার শাহাদাতের পর অদ্য এই তরবারি কোষমুক্ত হবে এবং কেয়ামত পর্যন্ত উহা কোষমুক্তই থাকবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেনযদি হযরত ওসমানের রক্তের প্রতিশোধ দাবী করা না হত তবে মানুষের উপর আকাশ হতে প্রস্তর বর্ষিত হত হযরত সামুর (রা) বলেনহযরত ওসমান(রাঃ)-হত্যার জের কেয়ামত পর্যন্ত বন্ধ হবে না এবং ইসলামী খেলাফত মদীনা হতে এমনভাবে বহিস্কৃত হবেযা কেয়ামত পর্যন্ত আর কখনও মদীনায় ফিরে আসবে না।
কাব ইবনে মালেক (রা) শাহাদাতের খবর শুনলেনসঙ্গে সঙ্গে তার মুখ হতে কয়েকটি কবিতা বের হয়ে আসল। যার মর্ম হল-
তিনি তার উভয় হস্ত বেধেঁ রাখলেনগৃহের দরজাও বন্ধ করে দিলেন। মনে মনে বললেনআল্লাহ সব কিছুই জানেন। তিনি তার সঙ্গীদিগকে বললেনশত্রুদের সহিত যুদ্ধ করিও না। আজ যে ব্যক্তি আমার জন্য যুদ্ধ না করবেসে আল্লাহর শান্তির ছায়ায় থাকিবে।
ওহে দর্শকগণ! হযরত ওসমানে শাহাদাতের ফলে পরস্পরের ভালবাসা কেমন করে নষ্ট হয়ে গেল। আর আল্লাহ তার জায়গায় পরস্পরের উপর শত্রুতার বোঝা চাপিয়ে দিলেন।
হায়! ওসমানের পর মঙ্গল এমনভাবে অন্তর্হিত হবেযেমন তীব্র ঘূর্ণিবাত্যা এসে সঙ্গে সঙ্গে অনর্হিত হয়ে যায়।
ওসমান (রাঃহত্যার ফলাফলঃ
হযরত ওসমানের শাহাদাতের খবর মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র মুসলিম জাহানে ছড়িয়ে পড়ল। এই সময় হযরত হোযাইফা (রা) বলেন,পরবর্তী সমস্ত ঘটনাই তাঁর সেই কথার ব্যাখ্যা প্রদান করেছে। তিনি বলেছিলেনহযরত ওসমানের শাহাদাতের ফলে মুসলিম জাহানে এমন এক বিপর্যয় নেমে এসেছেকেয়ামত পর্যন্তহ যা রুদ্ধ হওয়ার নহে।
হযরত ওসমানের রক্তাক্ত জামা ও হযরত নায়েলার কাটা আঙ্গুলি বনী উমাইয়ার তদানীন্তন বিশিষ্ট নেতাসিরিয়ার শাসনকর্তা হযরত আমির মোয়াবিয়ার নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হল। খলিফাতুল মুসলেমীনের এই রক্তাক্ত জামা যখন সিরিয়ায় গভর্নর হাউজে খোলা হয়,তখন চারিদিক হইতে কেবল প্রতিশোধ প্রতিশোধ আওয়াজ উঠল। বনী উমাইয়ার বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ সকলে আমির মোয়াবিয়ার নিকট সমবেত হলেন। এখানে এ কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্যহযরত আলীর খেলাফত হতে শুরু করে ইমাম হোসাইনের শাহাদাত এবং আমির মোয়াবিয়ার পর উমাইয়া ও আব্বাসিয়া খেলাফতের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যতগুলি দুর্ঘটনার সৃষ্টি হয়েছেপ্রত্যেকটি স্থানেই হযরত ওসমানের পবিত্র রক্ত ক্রিয়াশীল দেখতে পাওয়া যায়। হযরত ওসমানের এই শাহাদাত এমন একটি দুর্ঘটনাযদ্দ্বারা ইসলামের ভাগ্যই পরিবর্তিত হয়ে গেল। জঙ্গে জামালে যাহা কিছু হইয়াছেতাহাও এই রক্তের জের মাত্র।সিফফিনে যাহা হয়েছে তা এই ঘটনারই ফল। তৎপর কারবালাতে যাহা কিছু অনুষ্ঠিত হইয়েছে তাও এই ঘটনারই দুঃখজন পরিণতি। তৎপর উমাইয়া বনাম আব্বাসিয়া প্রশ্নে যে সমস্ত দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছেতাও এই বিভ্রান্তি বা বেদনাদায়ক অপকর্মেরই স্বাভাবিক পরিণতি মাত্র। হযরত ওসমানের শাহাদাতের পর বনী উমাইয়া ও বনী হাশেমের গোত্রীয় বিদ্বেষের আগুন আবার নূতনভাবে জ্বলে উঠল এবং ইসলামের যে বিদ্যুতসম শক্তি একদা সমগ্র দুনিয়ার শান্তির সমৃদ্ধির শপথ নিয়ে অগ্রসর হয়েছিলতাহা এমনভাবে বিপর্যস্ত হল যেঅতঃপর আর কখনও সেইবিপর্যয় সামলিয়ে উঠা সম্ভবপর হয়নি।

Comments

Popular posts from this blog

শরিয়ত,তরিকত,হাকিকত ও মারফত কাকে বলে? বিস্তারিত?

হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-বড় পীর এর জীবনী