Skip to main content

হযরত উসমান ইবন আফ্‌ফান রাঃ

উসমান ইবন আফ্‌ফান

 
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিনঅনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
ʿউসমান ইবন আফ্‌ফান
عثمان بن عفان
দুই নূরের অধিকারী (জিন্নুরাইন) (ذو النورين)
“আল-গনি” (উদার)
আমির আল-মুমিনুন
Rashidun Caliph Uthman ibn Affan - عثمان بن عفان ثالث الخلفاء الراشدين.svg
খুলাফায়ে রাশেদিন এর ৩য় খলিফা
রাজত্ব৬ নভেম্বর ৬৪৪ – ১৭ জুন ৬৫৬
পূর্বসূরীউমর ইবনুল খাত্তাব
উত্তরসূরীআলী ইবনে আবু তালিব
জন্ম৫৭৬ খ্রিঃ (৪৭ হিজরি )
তায়েফআল আরব
মৃত্যু১৭ জুন ৬৫৬ খ্রিঃ(১৮ জিল্ -হাজ ৩৫ হিজরি)[১][২][৩] (৭৯ বছর)
মদিনাআল আরবখুলাফায়ে রাশেদিন এর রাজত্বকালে
সমাধিজান্নাতুল বাকিমদিনা
দাম্পত্য সঙ্গী
পূর্ণ নাম
উসমান ইবন আফ্‌ফান আরবিعثمان بن عفان‎‎
বংশ!কুুরাইশ (বনু উমাইয়া)
পিতাআফ্‌ফান ইবন আবি আল-আস্
মাতাআরওরা বিনতু কুরাইজ
উসমান ইবন আফ্‌ফান (عثمان بن عفان) (c. ৫৮০ - জুন ১৭ ৬৫৬) ছিলেন ইসলামের তৃতীয় খলিফা। ৬৪৪ থেকে ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত খিলাফতে অধিষ্ঠিত ছিলেন। খলিফা হিসেবে তিনি চারজন খুলাফায়ে রাশিদুনের একজন। উসমান আস-সাবিকুনাল আওয়ালুনের (প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারী) অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও তিনি আশারায়ে মুবাশ্‌শারা'র একজন এবং সেই ৬ জন সাহাবীর মধ্যে অন্যতম যাদের উপর মুহাম্মদ (সা.) সন্তুষ্ট ছিলেন।[৪]। তাঁকে সাধারণত হযরত উসমান (রা.) হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

জীবনী[সম্পাদনা]

জন্ম[সম্পাদনা]

উসমানের জন্ম সন ও তারিখ নিয়ে বেশ মতপার্থক্য রয়েছে। অধিকাংশের মতে তার জন্ম ৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে অর্থাৎ হস্তীসনের ছয় বছর পর[৫]। এ হিসেবে তিনি হযরত মুহাম্মদ (সা.) থেকে ছয় বছরের ছোট। অধিকাংশ বর্ণনামতেই তাঁর জন্ম সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে। অবশ্য অনেকের বর্ণনামতে তাঁর জন্ম তায়েফ নগরীতে বলা হয়েছে।[৬]ডেভিড স্যামুয়েল মার্‌গোলিউথ২০তম শতাব্দীর একজন অমুসলিম ইসলামী চিন্তাবিদ লিখেছেন :
নবীর থেকে ছয় বছরের ছোট উসমান একজন কাপড়ের ব্যবসায়ী ছিলেন; এছাড়াও তিনি মহাজনের ব্যবসা করতেন, অর্থাৎ বিভিন্ন উদ্যোগে অর্থ বিনিয়োগ করতেন যার লভ্যাংশের অর্ধেক তিনি পেতেন (ইবন সা'দ, iii, ১১১) এবং অর্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তিনি ছিলেন অতি সূক্ষ্ণ (আল-ওয়াকিদি ডব্লিউ.২৩১)। [৭]

পরিবার ও বংশ[সম্পাদনা]

উসমানের কুনিয়া আবু আমর, আবু আবদিল্লাহ, আবু লায়লা। তাঁর উপাধি জুন-নুরাইন এবং জুল-হিজরাতাইন। তার পিতা আফ্‌ফান এবং মাতা আরওরা বিনতু কুরাইজ। তিনি কুরাইশ বংশের উমাইয়্যা শাখার সন্তান ছিলেন। তার ঊর্ধ্ব পুরুষ আবদে মান্নাফে গিয়ে মুহাম্মদের (সা.) বংশের সাথে মিলিত হয়েছে। তার নানী বায়দা বিনতু আবদিল মুত্তালিব ছিলেন মুহাম্মদের ফুফু।
ইসলাম গ্রহণের পর মুহাম্মদ (সা.) তাঁর কন্যা রুকাইয়্যার সাথে তাঁর বিয়ে দেন। হিজরি দ্বিতীয় সনে তাবুক যুদ্ধের পরপর মদিনায় রুকাইয়্যা মারা যায়। এরপর নবী তাঁর দ্বিতীয় কন্যা উম্মু কুলসুমের সাথে তাঁর বিয়ে দেন। এ কারণেই তিনি মুসলিমদের কাছে জুন-নুরাইন বা দুই জ্যোতির অধিকারী হিসেবে খ্যাত। তবে এ নিয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে। যেমন ইমাম সুয়ুতি মনে করেন ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই ওসমানের সাথে রুকাইয়্যার বিয়ে হয়েছিল[৪]। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তা এই ধারণা পরিত্যাগ করেছেন। উসমান এবং রুকাইয়্যা ছিলেন প্রথম হিজরতকারী মুসলিম পরিবার। তারা প্রথম আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন। সেখানে তাদের একটি ছেলে জন্ম নেয় যার নাম রাখা হয় আবদুল্লাহ ইবন উসমান। এরপর উসমানের কুনিয়া হয় ইবী আবদিল্লাহ। হিজরি ৪র্থ সনে আবদুল্লাহ মারা যায়। তাবুক যুদ্ধের পরপর রুকাইয়্যা মারা যান। এরপর উসমানের সাথে উম্মু কুলসুমের বিয়ে হয় যদিও তাদের ঘরে কোনো সন্তান আসে নি। হিজরি নবম সনে উম্মু কুলসুমও মারা যান।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

প্রাথমিক জীবন[সম্পাদনা]

অন্যান্য অনেক সাহাবীর মতোই ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উসমানের জীবন সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় নি। উসমান কুরাইশ বংশের অন্যতম বিখ্যাত কোষ্ঠীবিদ্যা বিশারদ ছিলেন। কুরাইশদের প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে তার অগাধ জ্ঞান ছিল। ইসলাম গ্রহণের পূর্বেও তার এমন বিশেষ কোনো অভ্যাস ছিল না যা ইসলামী নীতিতে ঘৃণিত। যৌবনকালে তিনি অন্যান্য অভিজাত কুরাইশদের মতো ব্যবসায় শুরু করেন। ব্যবসায়ে তাঁর সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। মক্কার সমাজে একজন ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন বলেই তাঁর উপাধি হয়েছিল গনি যার অর্ধ ধনী।
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে অর্থাৎ যৌবনকালে উসমান মুনাফাভিত্তিক এবং লাভজনক লেনদেনের মাধ্যমে অনেক টাকার মালিক হন।[৮]

মক্কায় থাকাকালীন অবস্থায়[সম্পাদনা]

ইসলাম গ্রহণ[সম্পাদনা]

৬১১ সালে তিনি সিরিয়া থেকে বানিজ্য করে ফিরে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইসলাম প্রচার সম্পর্কে জানতে পারে এবং আবু বকরের মাধম্যে রাসুলুল্লাহর কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি প্রথম দিকের ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম।[৯]

হিজরতের পর মদীনায় থাকাকালীন অবস্থায়[সম্পাদনা]

মৃত্যু[সম্পাদনা]

হযরত ওসমান রাঃ কে কুরঅান তেলওয়াত করা অবস্হায় শহীদ করা হয়।

খিলাফতের দায়িত্ব লাভ ও অবদান[সম্পাদনা]

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রশাসন[সম্পাদনা]

বিসমিল্লাহ লিখিত পারস্য মুদ্রা।
তিনি বায়তুল মাল থেকে জনগণকে দেওয়া ভাতা ২৫% বাড়িয়ে দেন যা উমারের সময় সবার জন্য নিদির্ষ্ট ছিল। বিজিত অঞ্চলের কৃষি[১০] জমি বিক্রির উপর উমারের নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে তিনি এর অনুমোদন প্রদান করেন। তার করা অর্থনৈতিক পুনঃগঠনের কারণে খিলাফাতের মুসলিম অমুসলিম সবাই অর্থনৈতিক সুফল ভোগ করতে পারতো।[১১]

ইসলামে গুরুত্ব



হযরত উমার (রা) মৃত্যুবরণ করবার সময় একটা করুণ আর হুলস্থূল সংকটের মুখে ছিল মুসলিম বিশ্ব। সেই সময় যিনি এর হাল ধরেন তিনি হযরত উসমান জুন্নুরাইন (রা)। সাহাবীদের মধ্যে ধনীতম এ মহান মানুষটি ইসলামের প্রাথমিক যুগে এত দান করে গিয়েছিলেন যে ইসলামি ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে সেসব কাহিনী। কিন্তু তবুও ভর দুপুরে দুষ্কৃতিদের এতটুকু হাত কাঁপেনি তাঁকে তাঁর স্ত্রীদের সরিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করতে। আজকের প্রবন্ধে আমরা রোর বাংলার পাঠকদের জন্য তুলে ধরব খলিফা হযরত উসমান (রা) এর শাসনামল আর কী পরিস্থিতির কারণে তাঁকে এই করুণ মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল।
ক্যালিগ্রাফিতে উসমান (রা) এর নাম। ছবিসূত্রঃ ইউটিউব
পূর্ববর্তী খলিফা হযরত উমার (রা) এর মৃত্যুর কারণ পাঠকরা নিশ্চয়ই জেনে থাকবেন আমাদের পূর্বের পোস্ট থেকে। মৃত্যুশয্যায় তিনি ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করলেন যাদের মধ্য থেকে খলিফা নির্বাচিত হবে। তারা ছিলেন হযরত আলী (রা), হযরত উসমান (রা), আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা), সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা), আল-জুবাইর (রা) ও তালহা (রা)। তাঁর মৃত্যুর তিন দিনের মাথায় যেন তারা খলিফা নির্বাচিত করেন এমনটাই বলে যান উমার (রা)। তিনি তাদের জিজ্ঞেসও করলেন তারা কাকে ভোট দেবেন। আলী (রা) কোনো উত্তর না দিলেও উসমান (রা) জানালেন তিনি আলী (রা)-কে ভোট দেবেন। জুবাইর (রা) বললেন তিনি আলী (রা) বা উসমান (রা)-কে ভোট দেবেন। আর সাদ (রা) বললেন তিনিও উসমান (রা)-কে দেবেন।
এটা অবাক করা বিষয় ছিল না কারো কাছে যখন পরবর্তী খলিফা নির্বাচিত হলেন হযরত উসমান (রা)। তিনিও কুরাইশ বংশেরই মানুষ; কিন্তু নবীর গোত্রের নয়, বরং মক্কার সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ধনী গোত্র উমাইয়াদের মাঝে তাঁর জন্ম। পিতার বিশাল সম্পত্তির উত্তরাধিকার তিনি পেয়েছিলেন। মক্কা বিজয়ের কিছু আগ পর্যন্ত এই উমাইয়ারা রাসুল (সা) এর চরম বিরোধী ছিল। কিন্তু তাদের মাঝে উসমান (রা) তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবু বকর (রা) এর পরামর্শে প্রথম দিকেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। মক্কার ধনী ব্যবসায়ী উসমান (রা) তাঁর সম্পদের বিশাল অংশ ইসলামের জন্য দিয়ে দেন। আবিসিনিয়াতে যখন তিনি সপরিবারে হিজরত করেছিলেন, তখন সেখানেও তিনি ব্যবসাতে সফল হন। আবার যখন মদিনার মতো কৃষিজীবী অঞ্চলে এলেন, সেখানে ইহুদী ব্যবসায়ীদের মাঝে একমাত্র মুসলিম ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠেছিল। আর এই বিশাল ধনসম্পদ সর্বদা তিনি ব্যয় করেন ইসলামের স্বার্থেই।
খলিফা নির্বাচিত হবার পর তিনি রাজকোষ থেকে কোনো বেতন নিতেন না। কারণ তাঁর নিজেরই যথেষ্ট অর্থ ছিল, আর কোনো অর্থ তাঁর দরকার পড়ত না। তবে মানুষের দেয়া উপহার তিনি সাদরে গ্রহণ করতেন, যেমনটা করতেন নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)।
উসমান (রা) এর স্ত্রী ছিলেন হযরত রুকাইয়া (রা) যিনি ছিলেন নবী (সা) এর কন্যা। কিন্তু তিনি যখন মারা যান, তখন নবী (সা) তাঁর আরেক কন্যা উম্ম কুলসুম (রা)-কেও উসমান (রা) এর কাছে বিয়ে দেন, এতটাই পছন্দ করতেন তিনি উসমান (রা)-কে। নবী বংশের দুজন আলো তাঁর স্ত্রী হয়ে ঘরে আসে। এজন্য উসমান (রা) এর এক উপাধি ছিল ‘জুন্নুরাইন’ যার অর্থ ‘দুই আলোর অধিকারী’। তিনি যেদিন খলিফা হন সেদিন ছিল ৬৪৪ সালের ৬ নভেম্বর। এ শাসনকাল চলেছিল ৬৫৬ সালের ১৭ জুন পর্যন্ত। চলুন আমরা সংক্ষেপে জেনে নেই কেমন গিয়েছিল তাঁর শাসনকাল।
পাঠকদের হয়ত মনে আছে, হযরত উমার (রা) এর পুত্র উবাইদুল্লাহ ক্রোধ আর প্রতিশোধের বশে হত্যা করেন হরমুজান, জাফ্রিনা ও ফিরোজের কন্যা আর স্ত্রীকে। উমার (রা) দায়িত্ব দিয়ে যান পরবর্তী খলিফাকে কারাবন্দী উবাইদুল্লাহ-র ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে। এটাই ছিল উসমান (রা) এর প্রথম মামলা ক্ষমতা গ্রহণের পর।
আবু বকর (রা) এর পুত্র আব্দুর রহমান ছাড়া আর কেউ বিশ্বাস করতেন না যে কোনো পারস্য ষড়যন্ত্র ছিল এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে। কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি। তাই এ চারজন নিরপরাধ নাগরিক হত্যার দায়ে উমার (রা) এর পুত্র উবাইদুল্লাহ-কে হয় মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে, নয়ত যদি মৃতের আত্মীয় রাজি থাকে তবে ব্লাডমানি প্রদান করতে হবে।
আলী (রা) বললেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অবশ্যই মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। কিন্তু আমর ইবনে আস (রা) বললেন, আগের দিন আমরা উমার (রা)-কে হারিয়েছি, আর আজ হারাবো তাঁর পুত্রকে? উমার (রা) এর প্রতি সম্মান রেখে দ্বিতীয় অপশন বেছে নেয়া উচিৎ।
তাবারীর বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি, নিহত হরমুজানের পুত্র ক্বামাজবান সাক্ষী হিসেবে খলিফার কাঠগড়ায় দাঁড়ান। তাঁর সাক্ষী থেকে বোঝা যায় হরমুজান ছিলেন নির্দোষ। ফিরোজ একাই এ কাজ করেছে, এর সাথে মদিনার আর কেউ জড়িত ছিল না। ক্বামাজবান প্রথমে উবাইদুল্লাহ-র মৃত্যু চাইলেন। কিন্তু পরে তিনি মত পরিবর্তন করলেন এবং আল্লাহ্‌র ওয়াস্তে তাঁকে ক্ষমা করে দিলেন।
উবাইদুল্লাহ-কে যখন উসমান ব্লাডমানি পরিশোধ করতে বললেন, তখন দেখা গেল তাঁর কাছে টাকা নেই। তখন উসমান (রা) নিজের পকেট থেকে পুরো টাকা পরিশোধ করেন; প্রত্যেক নিহতের জন্য এক হাজার দিনার করে, যেমনটা তখন নির্ধারিত ছিল।
উসমান (রা) এর শাসনামলকে আমরা চার ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথমে আমরা কথা বলব তাঁর আর্থসামাজিক অবদান, এরপর আসবে সামরিক অভিযানগুলো, এরপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কারণে তাঁকে স্মরণ করা হয় সেই কুরআন সংকলন আর সবশেষে আসবে যে ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি নিহত হন।
প্রথমেই আসা যাক আর্থসামাজিক অবদানে। উসমান (রা) ক্ষমতা নেবার পর জনগণের ভাতা ২৫% বৃদ্ধি করে দেন আগের তুলনায়। যেসব জায়গা বিজিত হবে, সেখানে জমি কেনাবেচা নিষিদ্ধ করেছিলেন উমার (রা)। এ নিষেধাজ্ঞা উসমান (রা) তুলে নেন এবং ব্যবসার সুযোগ বাড়িয়ে দেন। তাঁর আমলে অসাধারণ রকমের ভালো ছিল ইসলামি বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং জনগণ সমৃদ্ধিতে ছিল।
এরপর আমরা এখন আসি উসমান (রা) এর শাসনামলের সামরিক পরিস্থিতির দিকে। যে দিক দিয়ে উসমান (রা) সমালোচিত হয়েছিলেন সবচেয়ে বেশি সেটি ছিল তাঁর স্বজনপ্রীতি। তিনি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়োগ দিয়েছিলেন প্রধানত তাঁর উমাইয়া গোত্রীয় আত্মীয়দের। এমন না যে, যাদের নিয়োগ দিয়েছিলেন তারা একদমই সক্ষম কেউ ছিলেন না। তবুও এ দিক দিয়ে নিরপেক্ষতা বজায় না রাখবার জন্য ব্যাপারটা অনেকেই ভালোভাবে নেননি। অবশ্য, পরবর্তীতে কিছু কিছু ইতিহাসবিদ উসমান (রা) এর নিয়োগ দেওয়া মানুষদের ব্যাপারে দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন।
হযরত আবু বকর (রা) সাহাবী ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ানকে রোমান সিরিয়া আক্রমণে প্রেরণ করেছিলেন। পরে তিনি দামেস্কের গভর্নর হন। পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে, উমার (রা) এর সময় একটি ভয়াবহ প্লেগ হয়েছিল। সেই প্লেগে সিরিয়ার আবু উবাইদা (রা) মারা যান। এরপর মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা)-কে প্রেরণ করা হয় গভর্নর হিসেবে। তিনিও এ প্লেগে মারা যান। এরপর উমার (রা) ইয়াজিদ বিন আবু সুফিয়ানকে প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনিও প্লেগে মারা যান। এরপর উমার (রা) সিরিয়ার গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করেন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানকে। উল্লেখ্য, মুয়াবিয়া ছিলেন উসমান (রা) এর চাচাতো ভাই। উসমান (রা) এর শাসনামলে মুয়াবিয়া বিশাল এক মুসলিম নৌবাহিনী গড়ে তোলেন এবং সেই বাহিনীতে মুসলিম ছাড়াও মিসরীয় ও সিরীয় খ্রিস্টানরা যোগদান করেন। এই যুগান্তকারী নৌবাহিনী ৬৫৫ সালে দুর্দান্ত রোমান বাইজান্টিন নৌবাহিনীকে ভূমধ্যসাগরে পরাস্ত করে। এতে মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রসারে নতুন এক পালক যুক্ত হয়। আর বাইজান্টিন সাম্রাজ্যের বিদায়ঘণ্টা বেজে ওঠে।
৬৫১ সালে উসমান (রা) আব্দুল্লাহ ইবন জুবাইর ও আব্দুল্লাহ ইবনে সাদকে প্রেরণ করেন মাগ্রেবে। সেখানে রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াসের আত্মীয় গ্রেগরির প্রায় ১ বা ২ লাখ সেনাসম্পন্ন বাহিনীর মুখোমুখি হয় মুসলিম বাহিনী। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ইতিহাসগ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি, এই বিশাল বাহিনী মুসলিমদেরকে চারপাশ থেকে বৃত্তাকারে ঘিরে ফেলে, একদম পুরো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায় মুসলিম বাহিনী। তখন ইবন জুবাইর দেখতে পেলেন ঘোড়ার গাড়ির উপর গ্রেগরি বসে আছেন, তখন ইবনে সা’দকে তিনি ওদিকে যেতে বলেন। একটা ছোট গ্রুপ তখন ইবনে সা’দের নেতৃত্বে ঝাঁপিয়ে পড়ে গ্রেগরির উপর। গ্রেগরি মারা যেতেই বাইজান্টিন বাহিনীর মনোবল ভেঙে যায় এবং তারা পরাজিত হয়ে প্রস্থান করে।
উমার (রা) এর আমলে যেখানে সব সেনা অভিযান উমার (রা) এর নিজস্ব কমান্ডে হতো, উসমান (রা) এর সময় তা ছিল না। বরং তিনি স্বাধীনতা দিয়েছিলেন কমান্ডারদের নিজস্ব স্টাইলে অভিযান এগিয়ে নিয়ে যাবার। এভাবে ইবনে সা’দ এর নেতৃত্বে উত্তর আফ্রিকা এবং ইস্পাহান বা স্পেনের কিছু অংশ জয় করে নেন। স্পেনের আন্দালুসে তারা অভিযান চালিয়েছিলেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিক অবশ্য বলে থাকেন, ৭১১ সালের আগে এমনটা হয়নি।
উসমান (রা) এর আমলে ইসলামি বিশ্ব। ছবিসূত্রঃ Wikimedia Commons
ওদিকে আহনাফ ইবনে কায়েস (যিনি কিনা হরমুজানের বাহিনীকে শুস্থারে পরাজিত করেছিলেন উমার (রা) এর সময়) তুর্কমেনিস্তান, ফার্স, কারমান, সিস্তান, খোরাসান (আফগানিস্তান) জয় করে নেন। অনেকের কাছে মনে হতে পারে, কেন এভাবে রাজ্য বিজয় করতে হবে? ব্যাপারটা একবিংশ শতকে এসে অবাক লাগলেও তখন স্বাভাবিক ছিল। কারণ একটা রাজ্য যদি সম্প্রসারিত না হয়ে ক্ষমতাবান না হয়, তবে পাশের রাজ্য ক’দিন বাদে ঠিকই এই ছোট দুর্বল রাজ্যকে ছিনিয়ে নেবে। ‘ডু অর ডাই’ নীতিতে তখন চলতো সারা বিশ্ব।
উসমান (রা) এর তরবারির রেপ্লিকা। ছবিসূত্রঃ MySabah
লেখার এ পর্যায়ে আমরা একটা বহুল প্রচলিত প্রশ্নের উত্তর দেব, “কেন উসমান (রা) কুরআনের অনেক কপি পুড়িয়ে ফেলেন?” পশ্চিমাবিশ্বের অনেকেই ধারণা করে থাকে, কুরআন পুড়িয়ে ফেলা একটি গর্হিত কাজ। আসলে তা নয়; ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী কুরআনের একটি ভুল কপি বা ব্যবহারের অযোগ্য কপি যদি আপনি ‘ডিস্পোজ’ করতে চান, অর্থাৎ অপসারণ করতে চান যেন সেটা আর ব্যবহার করা না হয়, তবে সেটা আপনাকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে হবে, কিংবা মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে, এরকম কিছু উপায়ে ‘ডিস্পোজ’ করতে হবে।
এ বিষয়টি স্কলারদের জানা থাকলেও, সাধারণ অনেক মুসলিমেরই জানা নেই (বিশেষ করে বাংলাদেশে) যে পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছিল সাতটি আহরুফে। বা সহজ করে বলতে গেলে সাতটি আরবি উপভাষায়, সাত রকমভাবে। যেমন, একবার উমার (রা) মসজিদে গিয়ে দেখলেন এক লোক সুরা ফুরকান তিলাওয়াত করছেন। উমার (রা) বুঝতে পারলেন লোকটি ফুরকান তিলাওয়াত করছেন। কিন্তু তারপরেও তিনি লক্ষ্য করলেন ঐ সাহাবী ভিন্নভাবে পড়ছেন; তাঁর কিছু কিছু শব্দ ভিন্ন, উচ্চারণ ভিন্ন। অথচ উমার (রা) জানতেন কুরআন এক ও অভিন্ন। তখন তিনি ঐ সাহাবীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন; জিজ্ঞেস করলেন, এই তিলাওয়াত তুমি কার কাছ থেকে শিখেছো? তিনি জবাব দিলেন, আমি তো রাসুল (সা) এর কাছ থেকেই শিখেছি। উমার (রা) বললেন, আমিও তো তাঁর থেকেই শিখেছি; চলো তাঁর কাছে। যখন তারা বিষয়টি নিয়ে রাসুল (সা) এর কাছে উপস্থিত হলেন, তখন রাসুল (সা) বললেন, তারা দুজনেই সঠিক। কুরআন সাত রকম আরবি উপভাষায় নাজিল হয়েছে।
বিশুদ্ধ হাদিস থেকে আমরা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রা) ও আবু হুরাইরা (রা) এর বর্ণনা থেকে পাই, রাসুল (সা) বলেছেন, কুরআন নাজিল হয়েছে সাতটি আহরুফে। এ বিষয়ে তর্ক করা অবিশ্বাস; তোমরা যতটুকু জানো সেটাতেই আমল করবে, আর যে অংশ জানো না সেটা যে জানে তার জন্য রেখে দাও। এ বিষয়ে বুখারি ও মুসলিম শরীফে অনেকগুলো হাদিস রয়েছে।
কুরআন যে যুগে নাজিল হয়েছিল সে যুগে অধিকাংশ আরব ছিল নিরক্ষর, তার উপর বেদুইনরা তো ছিলই। যে কুরাইশি উপভাষায় কুরআন নাজিল হতো সে উপভাষায় দূর দূরান্তের বেদুইনরা কথা বলত না, তাদের ভঙ্গিমা ছিল ভিন্ন। সুতরাং এ আরবি তাদের জন্য কঠিন হতো। অথচ কুরআন আরবিতে সহজ করে নাজিল হবার কথা। বুখারি ও মুসলিম শরিফের হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি, তখন নবী মুহাম্মাদ (সা) জিবরাঈল (আ)-কে অনুরোধ করেন ভিন্ন উপভাষায় কুরআন আনয়নের। তখন ক্রমান্বয়ে জিবরাঈল (আ) একে একে সাতটি উপভাষায় কুরআনের আয়াতগুলো আনয়ন করেন। এ সাতটি উপভাষাতেই রাসুল (সা) ব্যক্তিভেদে শিক্ষা দেন। যেমন উমার (রা) কুরাইশের মানুষ, এজন্য তাঁর অন্যটা শিক্ষা করা হয়নি।
কিন্তু এমন ভাবার কোনো কারণ নেই যে, এই সাতটি ভার্শনে (ভার্সন শব্দের মানে এই নয় যে পুরো ভিন্ন এক একটা) অনেক পার্থক্য আছে। যদি তাই হতো তবে উমার (রা) বুঝতে পারতেন না যে ঐ সাহাবী সুরা ফুরকান তিলাওয়াত করছেন। কিন্তু বিষয়টি এত গোপনীয় ছিল যে উমার (রা) এর মতো বড় সাহাবীও প্রথম দিকে জানতেন না ব্যাপারটা। পার্থক্য ছিল সামান্য কিছু উচ্চারণে, আর কিছু শব্দের প্রতিশব্দ ব্যবহৃত হয়েছিল; অনেকটা ব্রিটিশ আর আমেরিকান ইংলিশের পার্থক্যের মতো। এক জায়গায় ফ্ল্যাট বললে আরেক জায়গায় এপার্টমেন্ট; এক জায়গায় এলিভেটর বললে আরেক জায়গায় এস্কেলেটর। তাঁর মানে কিন্তু এই না যে আমেরিকানরা ব্রিটিশ ইংলিশ বোঝেন না। তেমনই সকল আরবই সাত উপভাষার কুরআন বুঝতেন।
যা-ই হোক, নবী (সা) মারা যাবার প্রথম দু’বছরের মধ্যেই কুরাইশি ডায়ালেক্টে/উপভাষায় কুরআন এর প্রধান কপি বা মাস্টার কপি তৈরি করা হয়ে যায়, যা কালের বিবর্তনে হাফসা (রা) এর কাছে ছিল। কিন্তু ঐ যে বলছিলাম উপভাষার কথা। কুরাইশি, সাকিফি, হাওয়াজিনি, কিনানাই, তামিমি, হুজাইলি আর ইয়েমেনি- অন্তত এই সাত আরবি উপভাষায় কুরআন নাজিল হয়েছিল। কিন্তু প্রথম এবং নবী (সা) এর নিজের উপভাষাতে নাজিল হয়েছিল সেই কুরাইশি ভার্শনটিই এবং মাস্টারকপি ছিল সেটাই। যখন উসমান (রা) এর শাসন চলছে, তখন হযরত মুহাম্মাদ (সা) মারা যাবার অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। দূর দূরান্তে সাম্রাজ্য বিস্তার হয়ে গেছে। নতুন অনেকেই মুসলিম হয়ে গেছে। এমন না যে সকলে কুরাইশি উপভাষায় কথা বলে। তাই তারা তাদের পছন্দের ভার্শন বা আহরুফেই তিলাওয়াত করত। কিন্তু যেহেতু অনেকেই এই সাত ভার্শনের বৈধতার কথা জানতেন না, কেউ কেউ দাবি করতে লাগলেন তাদেরটা সঠিক, অন্যেরটা ভুল। আবার অনেকদিন পার হয়ে যাবার কারণে যারা নিজেরা নিজেদের উপভাষায় কুরআন লিখিয়ে নিচ্ছিলেন সেখানে ভুল ত্রুটি ধরা পড়ছিল, মানুষ মাত্রই ভুল করতে পারে। আবার অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহাবীও তাদের নিজেদের কপিতে দেখা যেতো, আয়াতের পাশে পাশে সাইডনোট লিখে রাখছিলেন, সেটা দেখে কেউ কেউ আবার সাইডনোটকেও কুরআনের আয়াতের অংশ ভেবে বসলে সমস্যা।
কুরআন নিয়ে এত মতবিভেদ দেখবার পর উসমান (রা) সিদ্ধান্ত নিলেন কেবল কুরাইশি মাস্টার কপি রেখে বাকিগুলো সরিয়ে ফেলবেন, যেন পুরো মুসলিম বিশ্ব জুড়ে কোনো তর্ক না থাকে এসব নিয়ে। অসংখ্য হাফিজ সাহাবী উপস্থিত থাকতেই যে কপি লিখিত হয়েছিল রাসুল (সা) এর নিজের মাতৃভাষায় সেটাই হবে আসল কপি। এজন্য তিনি আহ্বান করেন সকলে যেন অন্যান্য কপিগুলো দিয়ে যায়। সেগুলো শরিয়ত মোতাবেক তিনি পুড়িয়ে ফেলেন, এবং পুরো বিশ্ব জুড়ে এক ও অভিন্ন কুরাইশি আহরুফের কুরআন প্রচলিত করেন। সেই কপিটি তিনি অনেকগুলো কপি করিয়ে সকল প্রদেশে একটি করে পাঠিয়ে দেন। যার যার দরকার হবে সেই কপি থেকে যেন লিখিয়ে নেয়।
তবে কয়েকজন সাহাবী নিজের লেখা কুরআনের কপি হস্তান্তর করতে চাননি। না চাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কারণ এতদিন ধরে তিনি এটা পড়ে এসেছেন, এখন এটাকে বিদায় দিতে হবে- এটাতে খারাপ লাগবারই কথা। যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রা) ছিলেন এমন একজন, যিনি চাননি নিজের পাণ্ডুলিপি দিয়ে দিতে। তবে উসমান (রা)-কে তিনি ছোটোখাটো ব্যাপারেও খুব মান্য করতেন। তাই তাঁর সাথে এ ব্যাপারে বড় কোনো দ্বন্দ্ব হবার কাহিনীগুলো বানোয়াট বলেই মনে করেন সুন্নি স্কলাররা। কোনো কোনো সাহাবীর পাণ্ডুলিপিতে ১১৪টি সুরার চেয়ে কম সুরা ছিল। অর্থাৎ তারা সবগুলো সংগ্রহ করেননি বা লিখেননি। আবার যেমন উবাই ইবনে কা’ব (রা) অতিরিক্ত দুটো দুয়াকে তাঁর কুরআনের পাণ্ডুলিপির শেষে লিখে রেখেছিলেন। অনেকে ভুলবশত সেটা কুরআনের সুরা মনে করে থাকতে পারে। কিন্তু প্রচুর সংখ্যক কুরআনে হাফিজ থাকবার কারণে এসব ভুল পাত্তা পায়নি।
কুরাইশি আহরুফকেও যে অনেকে ভিন্নভাবে তিলাওয়াত করেননি তা নয়। এবার আর কোনো শব্দগত পার্থক্য ছিল না। পার্থক্য ছিল তিলাওয়াতে আর অ্যাক্সেন্টে। একে আমরা বলি কিরাত। মোটামুটি দশ রকম কিরাত পরবর্তীতে মানসম্পন্ন হিসেবে গ্রহণ করা হয়। হযরত উসমান (রা) চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন কুরআনকে ঠিকভাবে সংকলন করে মুসলিম জাতির ঐক্য ধরে রাখার কারণে। এ কারণে ১৪০০ বছর ধরে মুসলিমরা সেই কুরাইশি ম্যানুস্ক্রিপ্ট এক ও অভিন্নভাবে পড়ে আসছে নবী (সা) এর মাতৃভাষায়। স্কলারদের গবেষণার জন্য ভিন্নতাগুলো জন্য রেখে দেয়া আছে এবং সেটা উচ্চতর শিক্ষার বিষয়
এখন আমরা এ পোস্টের শেষ টপিক অর্থাৎ কী দুরবস্থা নেমে এসেছিল এবং কীভাবে উসমান (রা) মারা গেলেন সে ঘটনায় যাব।
মোটামুটি প্রথম ছয় বছর তাঁর শাসনের ব্যাপারে কারো অভিযোগ ছিল না। কিন্তু পরের ছয় বছরে ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। মূলত, ইসলামি প্রদেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদে আত্মীয়দের বসানোর মাধ্যমে অনেককে ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করা ছিল মূল কারণ, তার উপর উসমান (রা) এর কোমল মনোভাবের সুযোগ নিয়ে অনেকের করা দুর্নীতির অত্যাধিকতার অভিযোগ তো ছিলই। ৬৫৪ সালের দিকে উসমান (রা) এর শাসনের বিরোধিতা গড়ে ওঠে। ব্যাপারটা সম্পর্কে জানবার জন্য তিনি ১২ প্রদেশ থেকে গভর্নরদের মদিনায় ডেকে পাঠান। তদন্ত থেকে দেখা যায়, বেশিরভাগই শাসন নিয়ে খুব সন্তুষ্ট। ৬৫৫ সালে উসমান (রা) মক্কায় তাদেরকে হজ্বে আহ্বান করেন যারা তাঁর শাসনে অসন্তুষ্ট। দেখা গেলো অনেক শহর থেকেই অনেকে এসে উপস্থিত হয়েছে। মক্কাতে হাজির হয়ে তারা দেখলো মক্কার মানুষ উসমান (রা) এর বিরোধী না। তাদের দাবি উপস্থাপন বা আদায়ের জন্য এ পরিস্থিতি অনুকূল না। তখনও পরিস্থিতি খারাপ হয়নি, কিন্তু খারাপের পথে ছিল।
সাহাবী মুয়াবিয়া এ ব্যাপারটা টের পেয়ে উসমান (রা)-কে পরামর্শ দিলেন সিরিয়া ভ্রমণ করে যেতে তাঁর সাথে, কারণ সিরিয়ার পরিস্থিতি অনেক শান্ত। (মুয়াবিয়া সিরিয়ার গভর্নর ছিলেন) উসমান (রা) এ পরামর্শ কানে তুললেন না। তিনি বললেন তিনি নবীর শহর (মদিনা) ত্যাগ করবেন না। উসমান (রা) এর নিরাপত্তার জন্য উদ্বিগ্ন মুয়াবিয়া পরামর্শ দিলেন এবার। তিনি তাঁকে পাহারা দেবার জন্য সিরিয়া থেকে শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনী দেবেন কিনা। উসমান (রা) না করলেন, বললেন সিরিয়ান সেনা দেখলে মানুষ ক্ষেপতে পারে। পরে গৃহযুদ্ধ হয়ে যাবে।
উসমান (রা) এর নিজস্ব কুরআন। ছবিসূত্রঃ iOS Minaret.
মিসরের রাজনীতির কারণেই মূলত উসমানি খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নাড়াচাড়া দিয়ে উঠছিল। উসমান (রা) তখন মিসরের গভর্নর আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ-কে মদিনাতে ডেকে পাঠালেন। ওদিকে যেই না ইবনে সা’দ মিসর ত্যাগ করলেন, সাথে সাথে মুহাম্মাদ ইবনে আবু হুজাইফা এক মিলিটারি ক্যু করে মিসরের ক্ষমতা দখল করে ফেললেন। এই মুহাম্মাদ ইবনে আবু হুজাইফা তাঁর বাবাকে হারিয়েছিলেন ইয়ামামার যুদ্ধে, এরপর উসমান (রা) তাঁকে বড় করে তোলেন। কিন্তু কেন তিনি তাঁকে কোনো প্রদেশের গভর্নর করলেন না, সেই রাগ থেকে তিনি বিদ্রোহ করে বসলেন উসমান (রা) এর বিরুদ্ধে। অনেকটা যেন দুধ কলা দিয়ে সাপ পোষা।
উসমান (রা) এর হাতে যথেষ্ট সেনা ছিল না যে তিনি ইবনে সাদ-কে দিয়ে সাহায্য করবেন। তাই ইবনে সাদ পারলেন না ক্ষমতা পুনরায় নিজের হাতে নিতে।
মিসর থেকে ১০০০ বিদ্রোহী মদিনায় এসে হাজির হলো। তাদের উদ্দেশ্য ছিল উসমান (রা)-কে খুন করে সরকার উৎখাত করা। দেখা গেলো ইরাকের কুফা ও বসরা থেকেও বিদ্রোহী এলো মদিনাতে। মিসর থেকে আসা বিদ্রোহীরা এসে আলী (রা)-কে খলিফা হবার প্রস্তাব দিলো। যেখানে প্রথম থেকেই হযরত আলী (রা) এর খলিফা হবার সম্ভাবনা ছিল কিন্তু হতে পারেননি। তিনি নিজেই সাথে সাথে প্রত্যাখ্যান করলেন এই প্রস্তাব। কুফা থেকে যারা এসেছিল, তারা জুবাইর (রা)-কে প্রস্তাব দিলেন খলিফা হবার। আর বসরা থেকে আসা বিদ্রোহীরা প্রস্তাব দিলো তালহা (রা)-কে। তারা দুজনেই অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করলেন। একমাত্র উমাইয়ারা তখন জানপ্রাণ দিয়ে সমর্থন দিয়ে এসেছে উসমান (রা)-কে, আর হাতে গোনা কিছু মানুষ- তারাই কেবল উসমান (রা) এর পক্ষে ছিল। বাকিদের মতামত দুর্বল করে দিতে সক্ষম হয় বিদ্রোহীরা।
আলী (রা) তাদের বুঝিয়ে সুজিয়ে নিজেদের প্রদেশে ফেরত পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলেন। তারা যখন ফিরে যাচ্ছিল তখন মদিনা থেকে পাঠানো এক পত্রবাহককে বিদ্রোহীরা আটক করে। পত্রে গভর্নরকে লেখা ছিল, পৌঁছা মাত্রই বিদ্রোহীদের নেতাদেরকে শাস্তি দিতে। পত্রে খলিফার সীল ছিল। তারা এ চিঠি দেখে ক্ষেপে আবার মদিনা ফেরত আসলো। উসমান (রা) চিঠির ব্যাপারে কিছু জানতেন না বলে জানালেন। কিন্তু এবার আর বিদ্রোহীদের শান্ত করার কোনো উপায় থাকলো না। কিছু কিছু ইতিহাসবিদ ধারণা করেন, চিঠিটি মারওয়ান লিখে পাঠিয়েছিলেন, উসমান (রা) এর সেক্রেটারি। তবে আসল ব্যাপার আমরা জানতে পারবো না নিশ্চিত হয়ে।
উসমান (রা) গৃহবন্দী হয়ে পড়লেন। ঘরের চারপাশে বিদ্রোহীরা। যত দিন যেতে লাগলো, তত বিদ্রোহী জড়ো হতে লাগলো বাহিরে, আগুনও ধরিয়ে দিল। মদিনা থেকে অনেক স্থানীয় মানুষ মক্কায় হজ্ব করতে গিয়েছে আগেই। তাই কাছের মানুষও কম উসমান (রা) এর। বিদ্রোহীরা বুঝতে পারলো, হজ্ব শেষ হয়ে গেলেই পুরো সাম্রাজ্য থেকে আসা হাজিরা উসমান (রা) এর পক্ষে মদিনা ছুটে আসবে, এর আগেই যা করবার তা করতে হবে। উসমান (রা) এর অনুসারীরা তাদের বিরুদ্ধে লড়ার অনুমতি চাইলো। কিন্তু তিনি মানা করলেন। এক মুসলিম আরেক মুসলিমের রক্ত ঝরাতে পারে না। কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা) এবং আলী (রা) এর দুই পুত্র হাসান (রা) ও হুসাইন (রা) গেট বন্ধ করে পাহারা দিতে লাগলেন।
৬৫৬ সালের ১৭ জুন। যখন বিদ্রোহীরা দেখলো গেটে ভালোই পাহারা আছে, তখন মিসরীয় বিদ্রোহীরা প্রতিবেশীর বাড়ির দেয়াল বেয়ে উপরে উঠে ভেতরে নেমে পড়ল। গেটের পাহারা দেয়া সাহাবীরা জানলেনও না কী হলো। বিদ্রোহীরা উসমান (রা) এর কক্ষে চুপে চুপে ঢুকে পড়ল। তখন রোজা রাখা উসমান (রা) কুরআন পড়ছিলেন (উপরে সে কুরআনের ছবি আছে), তিনি যখন সুরা বাকারার ১৩৭ নং আয়াতে পৌঁছালেন, তখন বিদ্রোহীরা সজোরে মাথায় আঘাত করল। উসমান (রা) এর স্ত্রী নাইলা নিজের দেহ দিয়ে উসমান (রা)-কে রক্ষা করতে গেলেন, হাত উঁচু করে তরবারির আঘাত ঠেকাতে গেলেন। নাইলা-র আঙুলগুলো কেটে গিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। এরপরের আঘাতেই শহিদ হলেন উসমান (রা)। তাঁর দাসেরা তাঁকে বাঁচাতে গেলে একজন নিহত হয়, আর আরেকজন এক বিদ্রোহীকে মারতে সক্ষম হয়। [কথিত আছে, উসমান (রা) এর রক্তে ভেজা কুরআন তাশখন্দের মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।]
বিদ্রোহীরা উসমান (রা) এর লাশ বিকৃত করতে চেষ্টা করল। কিন্তু তাঁর স্ত্রী নাইলা আর উম্ম আলবানিন লাশের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রক্ষা করতে চাইলেন, তারা চিৎকার করতে থাকলেন। বিদ্রোহীরা পালিয়ে যাবার সময় ধনী উসমান (রা) এর বাসা লুট করে যায়, এমনকি মেয়েদের নেকাব পর্যন্ত নিয়ে যায়। যখন গেট থেকে সাহাবীরা এসে পৌঁছালেন ততক্ষণে সব শেষ, তারা কিছু করতে পারলেন না। মাঝখান দিয়ে হাসান (রা) ও মারওয়ান আহত হন।
টানা তিন দিন উসমান (রা) এর লাশ পড়ে ছিল বাসায়। নাইলা তখন কয়েকজন সমর্থকের সহায়তায় তাঁর দাফন দেবার চেষ্টা করলেন। মাত্র ১২ জন কাছের মানুষ পাওয়া গেল। গোধূলির সময় লাশ নিয়ে যাওয়া হলো, কোনো কফিন বা খাটিয়া পাওয়া যায়নি। তাঁকে কোনো গোসল দেয়া হয়নি, কারণ ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী শহীদদের কোনো গোসল নেই। কাফনের কাপড়ও পরানো হয়নি। যে কাপড়ে তিনি মারা যান, সে কাপড়েই তাঁকে কবরে নিয়ে যাওয়া হয়।
আলী (রা), হাসান (রা), হুসাইন (রা) ও অন্যরা লাশ বহন করলেন। রাতের আঁধারে নাইলা পেছন পেছন আসছিলেন একটি কুপিবাতি নিয়ে। কিন্তু সেটাও নিভিয়ে দিতে হলো যেন বিদ্রোহীরা টের না পায়। নাইলার সাথে একমাত্র অন্য যে নারী ছিলেন তিনি আয়িশা (রা)।
মদিনার জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে পৌঁছানোর পর দেখা গেলো বিদ্রোহীরা টের পেয়ে সেখানে হাজির। তারা মুসলিম কবরস্থানে উসমান (রা)-কে দাফন করতে দেবে না। নিরুপায় হয়ে তাঁকে দাফন করা হলো পেছনের ইহুদী কবরস্থানে। [পরবর্তীতে উমাইয়া খলিফারা এই দুই কবরস্থানের প্রাচীর ভেঙে দুই কবরস্থান এক করে ফেলেন, যেন উসমান (রা) মুসলিম কবরস্থানে শায়িত হতে পারেন।]
জানাজা পড়ালেন জাবির (রা)। কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া লাশ কবরে নামানো হলো। দাফনের পর আইশা (রা) ও নাইলা কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু নীরবতা বজায়ে রাখবার জন্য তাদের চুপ থাকতে হলো। নীরবেই চলে গেলেন উসমান (রা)।
উসমান (রা) এর কবর। ছবিসূত্রঃ Wikimedia Commons
কিন্তু পরবর্তী খলিফা যিনি হবেন, সেই আলী (রা) কী পদক্ষেপ নিবেন এই বিদ্রোহীদের ব্যাপারে? তিনি কি এই জঘন্য ঘটনার ন্যায্য প্রতিশোধ নিয়ে মুসলিমদের ও উসমান (রা) প্রিয়জনদের সন্তুষ্ট করবেন? নাকি গৃহযুদ্ধ এড়াবার জন্য তাদের ক্ষমা করে দিয়ে বিরাগভাজন হবেন?
এক বিশাল সিদ্ধান্ত নেবার দায়ভার মাথায় নিয়ে শুরু হলো আলী (রা) এর খেলাফত। পরের পর্বে আমরা জানবো কেমন গিয়েছিল আলী (রা) এর শাসন এবং কেনই বা তিনি উমার (রা) এর মতোই ফজরের ওয়াক্তে এক আততায়ীর তরবারির আঘাতের কারণে মৃত্যুবরণ করেন।
হযরত উসমান (রা)- এর চরিত্র বৈশিষ্ট্য
হযরত উসমান (রা) খিলাফতে রাশেদা’র তৃতীয় খলীফা। তাঁহার ব্যক্তিগত চরিত্রে ‘খলীফায়ে রাশেদ’ হওয়ার সব বৈশিষ্ট্যই পূর্ণ মাত্রায় বর্তমান ছিল। তিনি স্বভাবতঃই পবিত্রচরিত্র,বিশ্বাসপরায়ণ,সত্যবাদী, ন্যায়নিষ্ঠ, সহনশীল এবং দরিদ্র-সহায় ছিলেন। জাহিলিয়াহ যুগের ঘোরতর মদ্যপায়ী সমাজে বসবাস করা সত্ত্বেও মদ্য ছিল তাঁহার অনাস্বাদিত। রাসূলে করীম (স)-এর পবিত্র সাহচর্য তাঁহার নৈতিক চরিত্রকে অধিকতর নির্মল,পরিচ্ছন্ন ও দীপ্তিমান করিয়া তুলিয়াছিল।
বস্তুত আল্লাহ্‌র ভয়ই নৈতিক চরিত্রের মূল উৎস। যাঁহার দিল আল্লাহ্‌র ভয়ে ভীত-কম্পিত নয়, সে না করিতে পারে হেন পাপ কার্যের উল্লেখ করা যায় না। হযরত উসমান (র) আল্লাহ্‌র ভয়ে সর্বদা কম্পিত ও অশ্রুসিক্ত থাকিতেন। কবর দেখিলে তিনি অস্থির হইয়া পড়িতেন। তিনি প্রায়ই রাসূলে করীম (স)-কে উদ্ধৃত করিয়া বলিতেনঃ কবর হইল পরকালীন জীবনের প্রথম পর্যায়। এই পর্যায়টি সহজে ও নিরাপদে অতিক্রম করা গেলে পরবর্তী সব কয়টি পর্যায়ই সহজে অতিক্রান্ত হইবে বলিয়া আশা করা যায়। পক্ষান্তরে ইহাতেই বিপদ দেখা দিলে পরবর্তী সব পর্যায়ই কঠিন হইয়া দাঁড়াইবে।
হযরত উসমান (রা) ইসলামের প্রায় সব কয়টি যুদ্ধে রাসূলে করীম (স)-এর সহগামী ছিলেন এবং সর্বক্ষেত্রেই তিনি তাঁহার জন্য আত্মোৎসর্গীকৃত হইয়াছিলেন। দৈনন্দিন জীবনেও রাসূলে করীম (স)-এর দুঃখ-কষ্ট দূরীভূত করার জন্য তিনি সর্বদা সচেতন ও সজাগ-সক্রিয় থাকিতেন। রাসূলে করীম (স)-এর প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা,ভক্তি ও সম্মান প্রদর্শনে তিনি অতিশয় সচকিত থাকিতেন। তিনি যে হস্তে রাসূলে করীম (স)-এর হস্ত স্পর্শ করিয়া ইসলামের বায়’আত গ্রহণ করিয়াছিলেন, উহাতে জীবনে কোন দিন একবিন্দু মালিন্যও লাগিতে দেন নাই। তিনি আপন খিলাফত আমলে রাসূলে করীম (স)-এর পরিবারবর্গের প্রয়োজন পূরণের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছিলেন, যেন তাঁহাদিগকে কোনরূপ দৈন্য ও অসুবিধার সম্মুখীন হইতে না হয়।
রাসূলে করীম (স)-এর প্রতি তাঁহার এইরূপ অকৃত্রিম ও সুগভীর ভক্তি-শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠাপূর্ণ ভালোবাসা ও আন্তরিকতার অনিবার্য পরিণতি এই ছিল যে, তিনি ছোট-বড় প্রত্যেকটি ব্যাপারেই তাঁহাকে অনুসরণ করিয়া চলিবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালাইতেন। সাধারণ কথা, কাজ ও গতিবিধিতেও রাসূলে করীম (স)-এর হুবহু অনুসরণ করিবার জন্য তাঁহার চেষ্টার কোন ত্রুটি হইত না। নবী করীম (স)-কে তিনি যেভাবে অযু করিতে দেখিয়াছেন, নামায পড়িতে দেখিয়াছেন, লাশের প্রতি আচরণ করিতে দেখিয়াছেন, তিনিও এইসব কাজ ঠিক সেইভাবেই সম্পন্ন করিতেন। কাহাকেও রাসূলে করীম (রা)-এর সুন্নাতের বিপরীতে বা ভিন্নতর রীতিতে কোন কাজ করিতে দেখিলে সঙ্গে সঙ্গেই তিনি উহাতে আপত্তি জানাইতেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করিতেনঃ ‘তুমি কি রাসূলে করীম (স)-কে এই কাজ করিতে নিজ চক্ষে দেখ নাই’। বস্তুত রাসূলে করীম (স)-এর এইরূপ আক্ষরিক অনুসরণই ছিল একজন আদর্শবাদী সাহাবী হিসাবে তাঁহার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
লজ্জাশীলতা ও বিনয়-নম্রতা ছিল হযরত উসমান (রা)-এর এক বিশিষ্ট ধরণের গুণ। ঐতিহাসিক ও জীবনচরিত রচয়িতাগণ তাঁহার লজ্জাশীলতার কথা বিশেষ গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করিয়াছেন। স্বয়ং রাসূলে করীম (স)-ও তাঁহার এই লজ্জাশীলতাকে বিশেষ মর্যাদা দিতেন বলিয়া উল্লেখিত হইয়াছে।
হযরত উসমান (রা) তাঁহার স্বভাবসুলভ লাজুকতা, বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা এবং সীমাহীন পারিবারিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে লালিত-পালিত হওয়ার কারণে উত্তম পোশাক-পরিচ্ছদ ও উৎকৃষ্ট খাদ্য গ্রহণে অভ্যস্থ ছিলেন। হযরত উমর ফারুক (রা)-এর ন্যায় কষ্ট-সহিষ্ণুতা ও প্রকৃতিগত কঠোরতা তাঁহার ছিলনা। কিন্তু তাই বলিয়া তিনি জাঁকজমক ও বিলাস-ব্যসনপুর্ণ জীবন যাপন করিতেন, এমন কথা মনে করিবার কোন কারণ নাই।সত্য কথা এই যে, তিনি নিজে বিপুল ধন-সম্পদের অধিকারী হইয়াও কিছুমাত্র বড়লোকী জীবন-মান গ্রহণ করেন নাই। এই কারণে বিলাসিতা ও জাঁকজমকপূর্ণ জীবনধারা ছিল তাঁহার নিকট অত্যন্ত অপছন্দনীয়।
তিনি স্বভাবগতভাবে অতি বিনয়ী ও নিরহংকার ছিলেন। তাঁহার পারিবারিক কাজকর্মের জন্য বহু সংখ্যক লোক নিয়োজিত থাকা সত্ত্বেও নিজের যাবতীয় কাজকর্ম তিনি নিজেই সম্পাদন করিতেন এবং ইহাতে কোনরূপ লজ্জা বা অপমান বোধ করিতেন না। ব্যক্তিগত জীবনে কার্পণ্য কাহাকে বলে তাহা তিনি জানিতেন না। তিনি ছিলেন তদানীন্তন আরবের সর্বাধিক ধনাঢ্য ব্যক্তি। সেই কারণে দানশীলতা ছিল তাঁহার চরিত্রের প্রধান ভূষণ। তিন নিজের ধন-সম্পদ নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিধানে নয়- সাধারণ জনকল্যাণেই ব্যয় করিতে থাকিতেন। ইসলামের কাজে তাঁহার ধন-সম্পদ যতটা ব্যয়িত হইয়াছে, তদানীন্তন সমাজে এই দিক দিয়া অন্য কেহই তাঁহার সমতুল্য হইতে পারে না।
মদীনায় পানির সমস্ত কূপ লবনাক্ত ছিল। শুধু ‘রুমা’ নামক একটি কুপ হইতে মিষ্টি পানি পাওয়া যাইত; কিন্তু উহার মালিক ছিল জনৈক ইয়াহুদী। হযরত উসমান (রা) জনগণের প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে উক্ত কূপটি বিশ হাজার দিরহামের বিনিময়ে ক্রয় করিয়া জনসাধারণের জন্য ওয়াকফ করিয়া দেন। নগরীতে মুসলমানদের সংখ্যা দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাওয়ার দরুণ মসজিদে নববী সম্প্রসারিত করা অপরিহার্য হইয়া পড়িলে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করিয়া এই অত্যাবশ্যকীয় কাজটি সম্পন্ন করিয়া ফেলেন। অনুরূপভাবে তাবুক যুদ্ধকালে নিজস্ব তহবিল হইতে অর্থব্যয় করিয়া তিনি সহস্র মুজাহিদকে সশস্র ও সুসংগঠিত করিয়া দেন। অথচ এই সময় মুসলমানদের দৈন্য ও দারিদ্র তাঁহাদিগকে নির্মমভাবে পীড়িত ও উদ্বিগ্ন করিয়া তুলিয়াছিল।এক কথায় বলা যায়, উসমান (রা) ছিলেন এক অতুলনীয় দানশীল ব্যক্তি। ব্যক্তি-মালিকানার ধন-সম্পদ হওয়া সত্ত্বেও তাঁহার হস্তে উহা সাধারণ জনগণের কল্যাণে ব্যাপকভাবে ব্যয়িত হইয়াছে। পুঁজিবাদী বিলাস-ব্যাসন কিংবা শোষণ-পীড়নের মালিন্য তাঁহার ব্যক্তি মালিকানাকে কিছুমাত্র কলুষিত করিতে পারে নাই।১ {বদান্যতার প্রবাদ পুরুষঃ বদান্যতা বা দানশীলতা ব্যাপারে হযরত উসমান (রা) ছিলেন অবিশ্বাস্য রকমের উদারহস্ত। তাঁহার দান খয়রাতের এক-একটি ঘটনা ছিল রূপকথার মত। একদা জনৈক অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি সাহায্যের প্রত্যাশায় হযরত উসমান (রা)-এর শরণাপন্ন হইল। লোকটি যখন হযরত উসমান (রা)-এর বাড়ীর সন্নিকটে পৌঁছিল, তখন তিনি (উসমান)নিবিষ্টচিত্তে মাটি হইতে সরিষার দানা খুঁটিয়া খুঁটিয়া তুলিতেছিলেন। এই দৃশ্য অবলোকন করিয়া আগন্তুক লোকটি ভীষণভাবে হতাশাগ্রস্ত হইয়া পড়িল। সে উসমান (রা)-কে এক নিকৃষ্ট কৃপণ ব্যক্তি ভাবিয়া ফিরিয়া যাইতে উদ্যত হইল। সহসা উসমান (রা) আগন্তুক লোকটিকে দেখিতে পাইলেন। তিনি তাহাকে কাছে ডাকিয়া এইভাবে ফেরত যাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। লোকটি সব ঘটনা আদ্যপান্ত খুলিয়া বলিল। উসমান (রা)লোকটির কথা শুনিয়া একটু মুচকি হাসিলেন। ঘটনাক্রমে এই সময় পণ্য-সামগ্রী বোঝাই সাতটি উট আসিয়া সেখানে থামিল। উসমান (রা)উটসহ সমগ্র পণ্য-সামগ্রীই আগন্তুককে দান করিয়া দিলেন। এই ঘটনায় লোকটি একেবারে হতবাক হইয়া গেল এবং উসমান (রা) সম্পর্কে তাহার বিরুপ ধারণার জন্য বারবার অনুশোচনা প্রকাশ করিতে লাগিল।–সম্পাদক}
হযরত উসমান (রা) ছিলেন ধৈর্য ও সহনশীলতার বাস্তব প্রতীক। দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-মুছিবত যত বড় এবং যত মারাত্মকই হউক না কেন, সবর,ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার শানিত অস্ত্রে তিনি উহার সব কিছুই ছিন্ন-ভিন্ন করিয়া দিতেন এবং সমস্ত প্রতিকূলতার মুকাবিলায় তিনি পর্বতের ন্যায় অবিচলরূপে দাঁড়াইয়া থাকিতেন।
তাঁহার জীবনধারা ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, পরিমিত ও সংযত। দিনের বেলায় খিলাফতের দায়িত্ব পালনে গভীরভাবে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও রাত্রের বেশীর ভাগ সময় তিনি নামায ও আত্মিক সাধনায় নিমগ্ন থাকিতেন। অনেক সময় তিনি সমগ্র রাত্রিও জাগিয়া কাটাইতেন এবং এক রাকয়াতেই পূর্ণ কুরআন মজীদ পড়িয়া ফেলিতেন। এই ধরণের ঘটনা তাঁহার জীবনে বহুবার সংঘটিত হইয়াছে।যে কয়জন সাহাবী ইসলামের পূর্বে জাহিলিয়াতের জামানায় লেখাপড়া শিখিয়াছিলেন, হযরত উসমান (রা) ছিলেন তাঁহাদের অন্যতম। এই কাজে তাঁহার যোগ্যতা ও দক্ষতা স্বয়ং নবী করীম (স) কর্তৃকও স্বীকৃত ও প্রশংসিত হইয়াছে। এই জন্য অন্যান্যের সঙ্গে তাঁহাকেও অহী লেখার কাজে নিযুক্ত করা হইয়াছিল। হযরত রাসূলে করীম (স)-এর প্রতি যখনই অহী নাযিল হইত, তখনই উহা লিখিয়া রাখার সুষ্ঠু ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইয়াছিল। হযরত উসমান (রা)এই কাজে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন।
অবশ্য লেখার কাজে পারদর্শী হইলেও বক্তৃতা-ভাষণে তিনি অতটা সক্ষম ছিলেন না। খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পর সর্বপ্রথম মিম্বারের উপর আরোহণ করিয়া তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কোন ভাষণ না দিয়া শুধু বলিলেনঃ
আমার পূর্ববর্তী খলীফাদ্বয়-আবূ বকর ও উমর (রা) পূর্বেই প্রস্তুতি লইয়া আসিতেন। আমিও ভবিষ্যতে প্রস্তুত হইয়াই আসিব। কিন্তু আমি মনে করি, বক্তৃতা-ভাষণে সক্ষম ইমামের (নেতার) চেয়ে কর্মদক্ষ ইমামই তোমাদের জন্য প্রয়োজন।
এই কথাটুকু বলিয়া তিনি মিম্বারের উপর হইতে নীচে অবতরণ করিলেন। অবশ্য ইহার পর তিনি বিভিন্ন সময় প্রয়োজন মত বক্তৃতা-ভাষণ দিয়াছেন এবং উহাতে তাঁহার যোগ্যতারও যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যাইত। তাঁহার ভাষণসমূহ খুবই সংক্ষিপ্ত,জ্ঞানগর্ভ এবং উচ্চমানের হইত।
হযরত উসমান (রা)-এর বর্ণিত একটি হাদীসে বলা হইয়াচেঃ ‘কুরআন মজীদ পড়া ও পড়ানো অতি উত্তম সওয়াবের কাজ’। এই হাদীস অনুযায়ী তিনি নিজে জীবনের শেষ মুহূর্তে পর্যন্ত আমল করিয়াছেন। সম্ভবতঃ এই কারণেই তিনি অধিকাংশ সময় কুরআন মজীদ তিলাওয়াতে অতিবাহিত করিতেন। তিনি পূর্ণ কুরআনেরও হাফিয ছিলেন। কুরআনের সহিত তাঁহার অন্তরের গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। জীবনের শেষ মুহূর্তে সশস্ত্র বিদ্রোহীরা যখন তাঁহাকে চতুর্দিক হইতে পরিবেষ্টন করিয়া ফেলিয়াছিল, তখনও তিনি সর্বদিক হইতে নিজেকে গুটাইয়া আনিয়া গভীর তন্ময়তা সহকারে কুরআন তিলাওয়াতে নিমগ্ন হইয়াছিলেন।
তিনি অহী-লেখক ছিলেন বিধায় কুরআন সম্পর্কিত জ্ঞানে তাঁহার অতুলনীয় পারদর্শিতা ছিল। বিভিন্ন জটিল বিষয়ে কুরআন হইতে দলীল পেশ করা এবং কুরআন হইতে শরীয়াতের বিধান খুঁজিয়া বাহির করায় তিনি বিশেষ দক্ষতা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের পরিচয় দিয়াছেন। কুরআন-বিরোধীদের ষড়যন্ত্র হইতে কুরআন মজীদকে সুরক্ষিত করার ব্যাপারেও তাঁহার অবদান চির অম্লান হইয়া থাকিবে। হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে তিনি অন্যান্য সাহাবীদের চেয়ে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করিতেন। এই কারণে তিনি মাত্র ১৪৬টি হাদীস রাসূলে করীম (স) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। অবশ্য এই সতর্কতা অনেকটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। ব্যক্তিগত রুচি ও দৃষ্টিকোণ হইতেই ইহা উৎসারিত। এই কারণে একই নবীর সাহাবী হওয়া সত্ত্বেও বর্ণিত হাদীসের সংখ্যার দিক দিয়া সাহাবীদের মধ্যে বিরাট তারতম্য হইয়াছে এবং ইহা ছিল খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।
হযরত উসমান (রা) হযরত আবূ বকর (রা) হযরত উমর ফারুক (রা) এবং হযরত আলী (রা)-র ন্যায় বড় বড় মুজতাহিদদের মধ্যে গণ্য না হইলেও শরীয়াতের বহু ব্যাপারে তিনি ইজতিহাদ করিয়াছেন। এই ধরণের ইজতিহাদ এবং বিভিন্ন মিমাংসা ও ফয়সালা ইসলামের গ্রন্থাবলীতে উল্লেখিত হইয়াছে। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁহার জ্ঞান ছিল অতুলনীয়। তিনি নিজে প্রত্যেক বৎসরই হজ্জ উদযাপন করিতেন ও ‘আমীরে হজ্জ’-এর দায়িত্ব পালন করিতেন। খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পরও তিনি একটিবারও হজ্জ উদযাপন হইতে বিরত থাকেন নাই। শরীয়াতের ব্যাপারে তিনি বিভিন্ন সময় যেসব রায় দিয়াছেন ও বিচার-ফয়সালা করিয়াছেন, তাহা ইসলামী শরীয়াতের বাস্তব ব্যাখ্যার দৃষ্টিতে চিরকাল অতীব মূল্যবান সম্পদ হইয়া থাকিবে। বিভিন্ন ইজতিহাদী ব্যাপারে অন্যান্য সাহাবীদের সহিত তাঁহার মতবৈষম্য ঘটিয়াছে। কিন্তু তিনি কুরআন-হাদীস যুক্তির ভিত্তিতে যে রায় দিতেন, তাহাতে তিনি সুদৃঢ় আত্মবিশ্বাসের দরুণই অবিচল হইয়া থাকিতেন। হযরত উসমান (রা) একজন সফল ও সার্থক ব্যবসায়ী ছিলেন বলিয়া হিসাব জ্ঞানে তাঁহার বিশেষ পারদর্শিতা ছিল। এই কারণে ‘ইলমুল-ফারায়েজ’ বা উত্তরাধিকার বণ্টন-বিদ্যায় তাঁহার বুৎপত্তি ছিল সর্বজনস্বীকৃত। এই বিদ্যার মৌলিক নীতি প্রণয়নে হযরত জায়েদ ইবনে সাবিত (রা)-এর সঙ্গে তাঁহার অবদান অবশ্য স্বীকৃতব্য। সাহাবীগণ মনে করিতেন, ফারায়েজ বিদ্যায় এই দুইজন পারদর্শীর অন্তর্ধানের পূর্বে ইহার সঠিক প্রণয়ন না হইলে এই বিদ্যাই বিলুপ্ত হইয়া যাইবে।

হযরত উসমান (রা)-এর খিলাফত
হযরত উসমান (রা)-এর বয়স যখন চৌত্রিস বৎসর, তখন মক্কা নগরে দ্বীন-ইসলামের দাওয়াত সূচিত হয়। তদানীন্তন সামাজিক নিয়ম-প্রথা,আচার-আচরণ এবং আরবের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে হযরত উসমান (রা)-এর নিকট তওহীদের দাওয়াত প্রথম পর্যায়ে নিতান্তই অপরিচিত থাকিয়া গিয়াছিল। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও তিনি তাঁহার ব্যক্তিগত পবিত্রতা,সত্যানুসন্ধিৎসা ও ন্যায়পরায়ণতার কারণে দ্বীন-ইসলামের দাওয়াত কবুল করার প্রস্তুত হইয়াছিলেন।
ইসলাম গ্রহন
নবুয়্যাতী মিশনের প্রথম পর্যায়েই হযরত আবূ বকর (রা) ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন।ইহার পরই তিনি ইসলাম প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। প্রথমে তিনি তাঁহার বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের মধ্যে ইসলামী দাওয়াতের প্রচার শুরু করেন। হযরত উসমান (রা)-এর সাথে তাঁহার গভীর সম্পর্ক এবং পরিচিত ছিল। একদিন তিনি তাঁহার নিকট ইসলামী দাওয়াতের ব্যাখ্যা পেশ করেন। হযরত উসমান (রা)সবকিছুই শুনিয়া এই মহাসত্যের প্রতি প্রচণ্ড আকর্ষণ অনুভব করিলেন এবং নবী করীম (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া ইসলাম কবুল করার জন্য প্রস্তুত হইলেন। পথিমধ্যে নবী করীম (স) সহিত সাক্ষাৎ হইলে তিনিও উসমানকে ইসলাম কবুল করার জন্য মর্মস্পর্শী ভাষায় আহ্বান জানাইলেন। এই ঘটনার প্রসঙ্গে হযরত উসমান (রা) বলিলেনঃ “রাসূলে করীমের (স)-এর মুখ-নিঃসৃত কথা কয়টি শুনিবার সঙ্গে সঙ্গে আমার হৃদয়ে প্রবল আলোড়নের সৃষ্টি হইল। তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমি শাহাদাতের কালেমা পাঠ করিতে শুরু করিয়া দিলাম এবং রাসূলে করীম (স)-এর হাতে হাত দিয়া ইসলাম গ্রহণ করিলাম’।
হযরত উসমান (রা) মক্কার অন্যতম শক্তিশালী উমাইয়া বংশের লোক ছিলেন। আর গোটা বংশটিই ছিল রাসূলে করীম (স)-এর বংশ বনু হাশিমের চরম প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিরুদ্ধবাদী। উমাইয়া বংশের লোকেরা রাসূলে করীম (স)-এর উত্তরোত্তর সাফল্য ও বিজয় লাভে বিশেষভাবে ভীত ছিল। কেননা উহার ফলে সমগ্র নেতৃত্ব ও প্রাধান্য উমাইয়া বংশের হস্তচ্যুত হইয়া বনু হাশিম বংশের হস্তগত হওয়ার প্রবল আশংকা ছিল। তদানীন্তন গোত্রবাদি সমাজে এই ব্যাপারটি যে কতটা সাংঘাতিক ছিল, গোত্রবাদের ধর্ম ও চরিত্র সম্পর্কে অবহিত লোকেরাই তাহা সহজেই অনুধাবন করিতে পারেন। কিন্তু হযরত উসমান (রা)-এর হৃদয়-দর্পণ বংশীয় ও গোত্রীয় হিংসাদ্বেষের কলুষ-কালিমা হইতে মুক্ত ও স্বচ্ছ ছিল বলিয়া শত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও ইসলাম গ্রহণ করা তাঁহার পক্ষে অসম্ভব হইয়া দাড়ায় নাই। তিনি যখন ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন তখন মুসলমানদের মোট সংখ্যা ছিল মাত্র পঁয়ত্রিশ কিংবা ছত্রিশ।
তাঁহার ইসলাম গ্রহণের পর নবী করীম (স) নিজেই আগ্রহী হইয়া তাঁহার কন্যা হযরত রুকাইয়া (রা)-র সহিত হযরত উসমান (রা)-এর বিবাহ সম্পন্ন করেন।
হিজরাত
মক্কা নগরে ইসলামের ক্রমবর্ধমান প্রসার ও শক্তি বৃদ্ধি ঘটিতে দেখিয়া মুশরিক সমাজ খুবই চিন্তান্বিত ও বিচলিত হইয়া পড়িল। তাহাদের ক্রোধ ও অসন্তোষ ক্রমশঃতীব্র হইতেও তীব্রতর হইয়া উঠিতে লাগিল। ইহার ফলে হযরত উসমান (রা)স্বীয় ব্যক্তিগত গুণগরিমা ও বংশগত মানমর্যাদা সত্ত্বেও ইসলামের জন্য অমানুষিক নির্যাতন ভোগ করিতে বাধ্য হন। ইসলাম ত্যাগে বাধ্য করার জন্য তাঁহার চাচা নিজে তাঁহাকে বাঁধিয়া রাখিত ও নির্মমভাবে প্রহার করিত। আত্মীয়স্বজনের মধ্য হইতে তেমন কেহই তাঁহাকে এই অবস্থা হইতে উদ্ধার করার জন্য আগাইয়া আসিতে প্রস্তুত হয় নাই। তাঁহার উপর এই অত্যাচারের মাত্রা ক্রমশঃবৃদ্ধি পাইতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ইহা হযরত উসমান (রা)-এর পক্ষে অসহ্য হইয়া উঠে। অবশেষে তিনি নবী করীম (স)-এর ইংগিতে একটি কাফেলা লইয়া সপরিবারে আবিসিনিয়ায় (ইথিওপিয়া) হিজরাত করিয়া গেলেন। কেবলমাত্র সত্য দ্বীন ও সত্য আদর্শের জন্য এই কাফেলাটি স্বদেশবাসীদের ত্যাগ করিয়া এক অজানা পথে রওনা হইয়া গেল।
আবিসিনিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইয়া যাওয়ার পর দীর্ঘদিন পর্যন্ত নবী করীম (স) তাঁহাদের সম্পর্কে কোন সংবাদ জানিতে পারেন নাই। এই কারণে তিনি খুবই চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হইয়াছিলেন। কিছুদিন পর তিনি যখন তাঁহাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছার সংবাদ জানিতে পারিলেন, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলিয়া উঠিলেনঃ
*******(আরবী)
‘এই জাতির মধ্য হইতে উসমানই সপরিবারে সর্বপ্রথম হিজরাতকারী ব্যক্তি’।
হযরত উসমান (রা) আবিসিনিয়ায় কয়েক বৎসর পর্যন্ত অবস্থান করেন। সেখান হইতে প্রত্যাবর্তনের পর কিছুদিন যাইতে না যাইতেই মদীনায় হিজরাত করার আয়োজন সুসম্পন্ন হয়। তখন উসমান (রা)-ও সপরিবারে মদীনায় চলিয়া গেলেন। হযরত উসমান (রা) ইসলাম ও কুফরের প্রথম সম্মুখ-সংঘর্ষে অর্থাৎ বদর যুদ্ধে যোগদান হইতে ঘটনাবশতঃই বিরত থাকিতে বাধ্য হন। এই যুদ্ধের সময় তাঁহার স্ত্রী নবী-তনয়া রুকাইয়া (রা) কঠিন রোগে আক্রান্ত হইয়া পড়েন। এই কারণে নবী করীম (স)তাঁহাকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি না দিয়া রোগিনীর সেবা-শুশ্রূষা করার দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিলেন। কিন্তু এই দুঃখে তিনি ভারাক্রান্ত হইয়া সারাটি জীবন অতিবাহিত করেন। ইসলামের প্রথম সমরে শরীক হইতে না পারার বেদনা তিনি জীবনে মুহূর্তের তরেও ভুলিতে পারেন নাই।
কিন্তু ইহার পর যে কয়টি যুদ্ধই সংঘটিত হইয়াছে, উহার প্রত্যেকটিতেই তিনি পূর্ণ সাহসিকতা ও বীর্যবত্তা সহকারে রাসূলে করীম (স)-এর সঙ্গী হইয়াছেন। ষষ্ঠ হিজরী সনে নবী করীম (স) কা’বা জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সদলবলে মক্কার পথে রওয়ানা হইয়া যান। পথিমধ্যে হুদাইবিয়া নামক স্থানে কাফেলাটি প্রতিরুদ্ধ হইলে নবী করীম (স)উসমান (রা)-কে রাষ্ট্রদূত হিসাবে কাফির মুশরিকদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার দায়িত্ব দিয়া মক্কায় প্রেরণ করেন। মক্কায় তাঁহাকে কাফির মুশরিকরা অবরুদ্ধ করিয়া ফেলে। কয়েকদিন পর্যন্ত তাঁহার সম্পর্কে কোন সংবাদ জানিতে না পারায় নবী করীম (স) এবং মুসলমানগণ বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন হইয়া পড়েন। এই সময় চারিদিকে রাষ্ট্র হইয়া পড়ে যে, হযরত উসমান (রা)-কে শহীদ করা হইয়াছে। এই খবর শুনা মাত্রই নবী করীম (স) ইহার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য সঙ্গের চৌদ্দশত সাহাবীর নিকট হইতে বায়’আত গ্রহণ করেন।ইসলামের ইতিহাসে ইহা ‘বায়’আতে রিজওয়ান’- আল্লাহ্‌র সন্তোষলাভে চরম আত্মোৎসর্গের প্রতিশ্রুতি- নামে অভিহিত ও স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হইয়া রহিয়াছে।
খলীফারূপে নির্বাচন
হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-এর পর হযরত উমর ফারুক (রা) দীর্ঘ দশটি বৎসর পর্যন্ত ইসলামী খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি অজ্ঞাতনামা আততায়ীর ছুরিকাঘাতে আহত হইয়া পড়িলে জীবনের সায়াহ্নকালে পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের জন্য ছয় সদস্য-বিশিষ্ট একটি বোর্ড গঠন করিয়া দেন। হযরত আলী, হযরত উসমান, হযরত জুবাইর, হযরত তালহা, হযরত সায়াদ, হযরত সায়াদ ইবনে আক্কাস এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা) এই বোর্ডের সম্মানিত সদস্য ছিলেন। তিন দিনের মধ্যেই খলীফা নির্বাচনের কাজ সম্পন্ন করার জন্যও এই বোর্ডকে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছিল। হযরত উমর ফারুক (রা)-এর কাফন-দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর খলীফা নির্বাচনের ব্যাপারে মনোযোগ দেওয়া হয়। দুইদিন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলাপ-আলোচনা, মত বিনিময়, জনমত যাচাই ইত্যাদি কাজে অতিবাহিত হইয়া যায়। তৃতীয় দিনে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা)-এর প্রস্তাবক্রমের হযরত উসমান (রা)-কে খলীফা নির্বাচন করা হয়। সমবেত সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে হযরত আলী (রা) সর্বপ্রথম তাঁহার হাতে ‘বায়’আত’ করেন। অতঃপর উপস্থিত জনতা বায়’আতের জন্য ভাঙিয়া পড়ে। এইভাবে ২৪ হিজরী সনের মুহাররম মাসের ৪ তারিখ সর্বসম্মতিক্রমে হযরত উসমান (রা) খলীফা পদে বরিত হন এবং খিলাফতে রাশেদার শাসনভার গ্রহণ করে।
খিলাফতের দায়িত্ব পালন
হযরত উমর ফারুক (রা) তাঁহার খিলাফত আমলে সিরিয়া, মিশর ও পারস্য জয় করিয়া সুসংবদ্ধ ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করিয়া লইয়াছিলেন। উপরন্তু শাসন-শৃঙ্খলা ও প্রশাসন ব্যাবস্থায় তিনি একটা শাসনতান্ত্রিক কার্যবিধি প্রবর্তন করিয়া গিয়াছিলেন। এই কারণে হযরত উসমান (রা)-এর পক্ষে খিলাফতের দায়িত্ব পালন অনেকটা সহজ হইয়াছিল। এই কাজে তিনি যুগপৎ হযরত সিদ্দীকের নমনীয়তা, কোমলতা ও দয়ার্দ্রতা এবং হযরত উমর ফারুক (রা)-এর প্রশাসনিক দক্ষতা, বিচক্ষণতা ও কঠোরতা অনুসরণ করিয়া চলিতেন। এক বৎসরকাল পর্যন্ত তিনি পূর্ববর্তী প্রশাসন ব্যাবস্থা অপরিবর্তিত রাখিয়াছিলেন। প্রাক্তন খলীফার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি হযরত সায়াদ ইবনে আক্কাস (রা)-কে কুফার গভর্নর নিযুক্ত করিয়াছিলেন। ইহা ছিল খলীফা হযরত উসমান (রা) কর্তৃক সম্পাদিত প্রথম নিয়োগ। পরে অবশ্য ২৬ হিজরী সনে তিনি তাঁহাকে পদচ্যুতও করিয়াছিলেন।
উসমানীয় খিলাফতের প্রথম বৎসরের মধ্যেই ত্রিপলি, আলজিরিয়া ও মরক্কো অধিকৃত হয়। ইহার ফলে স্পেনের দিকে মুসলমানদের অগ্রগতির দ্বার উন্মুক্ত হয়। সাইপ্রাসের উপর হযরত উমর ফারুক (রা)-এর খিলাফত আমলেই কয়েকবার সৈন্য অভিযান পরিচালনা করা হইয়াছিল। ২৮ হিজরী সনে হযরত আমীর মুয়াবিয়ার নেতৃত্বে ভূ-মধ্য সাগরে অবস্থিত এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপটির উপর মুসলিম বিজয়ের পতাকা উড্ডীন হয়। এইভাবে হযরত উসমান (আ)-এর খিলাফত আমলে ইসলামী রাজ্য সীমার বিপুলে বিস্তৃত ও সম্প্রসারন সাধিত হয়। কাবুল, হিরা, সিজিস্তান ও নিশাপুরে এই সময়ই ইসলামী খিলাফতের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
হযরত উসমান (রা)-এর দ্বাদশ বর্ষীয় খিলাফত আমলের প্রথম ছয়টি বৎসর পূর্ণ শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিয়মতান্ত্রিকতার মধ্যে অতিবাহিত হয়। বহু দেশ নিয়া গঠিত বিশাল এলাকা ইসলামী খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত হয়। বায়তুলমালে আয়ের পরিমাণ বিপুলভাবে বৃদ্ধি পায়। কৃষি, ব্যবসায় ও প্রশাসন ক্ষেত্রের অসাধারণ উন্নতি জন-জীবনে অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি আনিয়া দেয়। হযরত উসমান (রা)-এর খিলাফতের উল্লেখযোগ্য অবদান হইল ইসলামের বিশাল সাম্রাজ্যের প্রশাসন ব্যবস্থা উতরোত্তর দৃঢ়তর করিয়া তোলা এবং তীক্ষ্ণবুদ্ধিমত্তা, নির্ভুল ব্যবস্থাপনা ও উত্তম কর্মনীতির সাহায্যে বিজিত জাতিসমূহের বিদ্রোহাত্মক ভূমিকা ও তৎপরতা দমন করিয়া শান্তিপূর্ণ জীবন প্রতিষ্ঠা করা।
খলীফা হিসাবে হযরত উসমান (রা)-কে বহু সংখ্যক বিদ্রোহ দমন করিতে হইয়াছে। তাঁহার আমলে মিশরে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উত্তোলিত হয়, আর্মেনিয়া ও আযারবাইজান অঞ্চলের অধিবাসীরা ‘খারাজ’ দেওয়া বন্ধ করিয়া দেয়, খোরাসানবাসিরাও বিদ্রোহের মস্তক উত্তোলন করে। এইসব বিদ্রোহ ছিল বিজিত জাতিসমূহের মনে ধুমায়িত বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসামূলক বিষ-বাষ্পের বিস্ফোরণেরই পরিণতি। কিন্তু হযরত উসমান (রা) বিশেষ সতর্কতা ও বিচক্ষণতা সাহায্যে উহা দমন করিতে সক্ষম। কঠোরতা-কোমলতা সমন্বিত কর্মনীতি ফলে এই সমস্ত এলাকার জনগণ ইসলামী খিলাফতের আনুগত্য স্বীকার করিয়া লয়।
সামুদ্রিক বিজয়াভিযান হযরত উসমান (রা)-এর খিলাফত আমলের একটি বিশেষ অবদান। হযরত উমর (রা)-র সতর্কতামূলক নীতির ফলে সে আমলে মুসলমানদিগকে বিপদসংকুল সামুদ্রিক পথে অভিযানে প্রেরণ শুরু হইতে পারে নাই। কিন্তু হযরত উসমান (রা)-এর দুঃসাহসিকতা বিপদ-শংকাকে সহজেই অতিক্রম করা সম্ভবপর করিয়া দিয়াছিল। তাঁহার নিখুঁত সমর পরিকল্পনার ফলে রোমান সম্রাটের পাঁচশতটি যুদ্ধ জাহাজ সমন্বিত বিশাল নৌ বাহিনীকে চরম পরাজয় বরণ করিতে বাধ্য করা হয়।
খিলাফতে শাসন পদ্ধতি
খিলাফতে রাশেদার শাসন-পদ্ধতি পরামর্শ ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসাবে আরম্ভ হইয়াছিল। হযরত উমর ফারুক (রা)এই ব্যবস্থাকে অধিকতর সুদৃঢ় ও সুসংবদ্ধও করিয়া তোলেন। হযরত উসমান (রা)-ও তাঁহার প্রাথমিক আমলে এই ব্যবস্থাকে অব্যাহত রাখেন। তবে শেষ পর্যায়ে বনু উমাইয়্যাদের অভ্যুত্থানের ফলে ইহাতে অনেক বিপর্যয় সূচিত হয়। হযরত উসমান উহা রোধ করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালাইতে থাকেন এবং এই উদ্দেশ্যে দায়িত্বশীল লোকদের দেওয়া যে কোন কল্যাণমূলক পরামর্শ তিনি নির্দ্ধিধায় গ্রহন করেন।
প্রসঙ্গতঃউল্লেখ্য যে, খিলাফতী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের মৌলিক অধিকার রক্ষা শাসকদের কর্মনীতি ও কার্যাবলীর প্রকাশ্য সমালোচনা করার নিরংকুশ অধিকার লাভ করিয়া থাকে। এই অধিকার এতটুকু হরণ করার ইখতিয়ার স্বয়ং খলিফাকেও দেওয়া হয় নাই। ইহা অনস্বীকার্য যে, হযরত উসমান (রা)-এর শেষ পর্যায়ে পরামর্শ ভিত্তিক ব্যবস্থায় কিছুটা ফাটল ধরিতে শুরু করিয়াছিল। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও গণ-অধিকার কিছুমাত্র ক্ষুণ্ণ হইতে দেওয়া হয় নাই।
আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাই সাধারণতঃ দায়িত্বহীন ব্যক্তিদের তুলনায় অধিকতর উত্তম ও নির্ভুল মতামত প্রকাশে সক্ষ হইয়া থাকেন। এই কারণে বর্তমান কালেও বিভিন্ন সভ্য ও উন্নত দেশে এই ধরণের পরামর্শমূলক সংস্থা গঠন করা হইয়া থাকে। হযরত উসমান (রা) চৌদ্দশত বৎসর পূর্বে এই প্রয়োজন অনুভব করিয়া দায়িত্বশীল সরকারী কর্মচারীদের সমন্বয়ে এই ধরণের একটি পরামর্শ মজলিস গঠন করিয়াছিলেন। এই সংস্থার সদস্যদের নিকট হইতে সাধারণতঃলিখিত প্রস্তাবাবলী চাওয়া হইত। কুফা অঞ্চলে সর্বপ্রথম যখন শাসন-শৃঙ্খলায় উচ্ছৃংখলতা ও বিপর্যয় দেখা দেয়, তখন উহা নির্মূল করার উদ্দেশ্যে মজলিশ সদস্যদের নিকট হইতে লিখিত প্রস্তাবাবলী চাওয়া হইয়াছিল। মূল রাজধানীতেও মাঝে মাঝে এই ধরণের মজলিসের অধিবেশন আহ্বান করা হইত। ২৪ হিজরী সনে সমগ্র দেশের সার্বিক অবস্থার সংস্কার ও উন্নয়ন সাধন উদ্দেশ্যে রাজধানীতে এই মজলিসের যে অধিবেশন অনুষ্ঠিত হইয়াছিল, উহাতে এই পর্যায়ের অভিমতদানে সক্ষম অধিকাংশ দায়িত্বশীল কর্মচারীরা যোগদান করিয়াছিলেন।
প্রশাসন ব্যবস্থাকে অধিকতর সক্রিয় ও সুদৃঢ় করিয়া তুলিবার উদ্দেশ্যে সমগ্র দেশের প্রদেশ ও জিলাভিত্তিক বিভাজন ও পুনর্গঠন ছিল অত্যন্ত জরুরী কাজ। হযরত উমর ফারুক (রা) সমগ্র সিরিয়া অঞ্চলের দামেশক, জর্ডান ও ফিলিস্তিন এই এই তিনটি ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশে বিভক্ত করিয়াছিলেন। হযরত উসমান (রা) এই সমস্ত অঞ্চল একজন গভর্নরের অধীন করিয়া একটি বিশাল বিস্তীর্ণ প্রদেশ বানাইয়াছিলেন। প্রদেশের এই পুনর্গঠন শাসন-শৃঙ্খলার দৃষ্টিতে খুবই ফলপ্রসূ হইয়াছিল। শেষকালে সমগ্র দেশ যখন বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার লীলাভূমিতে পরিণত হইয়াছিল, তখন সিরিয়ার সহিত সংশ্লিষ্ট জিলাসমূহ এই বিপর্যয় হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল।
হযরত উসমান (রা) সেনাধ্যক্ষের একটা নূতন পদ সৃষ্টি করিয়াছিলেন। ইহার পূর্ব পর্যন্ত প্রাদেশিক গভর্নরই সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে অবস্থিত সেনাবাহিনীর অধিনায়কের দায়িত্ব ও পালন করিতেন। ইহাতে কাজের বিশেষ অসুবিধা হওয়া অবধারিত ছিল।
খিলাফতে রাশেদার শাসন পদ্ধতিতে খলীফাই রাষ্ট্রপ্রধান। তিনি প্রশাসন বিভাগের সর্ব্বোচ্চ ক্ষমতায় আসীন। অধিনস্থ সমস্ত শাসনকর্তা ও প্রশাসন কর্মকর্তাদের উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা খলিফারই অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ কাজ। হযরত উসমান (রা) স্বভাবতঃই দয়ার্দ্র-হৃদয় ও নরম মেজাজের লোক ছিলেন। ব্যক্তিগত পর্যায়ে ধৈর্য,সহিষ্ণুতা,ক্ষমা ও তিতিক্ষার বাস্তব প্রতিমূর্তি ছিলেন তিনি। কিন্তু দেশ শাসন ও রাষ্ট্রীয় কার্যাদি সুসম্পন্ন করার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও ক্ষমাহীন। কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ, খোঁজ খবর লওয়া এবং দোষত্রুটি পরিলক্ষিত হইলে কঠোর হস্তে উহার সংশোধন করা তাঁহার স্থায়ী কর্মনীতি ছিল। এইক্ষেত্রে কোন সম্মানিত কর্মচারীরাও যদি তেমন কোন দোষ ধরা পড়িত, তাহা হইলে তাহাকে পদচ্যুত করিতেও তিনি একবিন্দু কণ্ঠিত হইতেন না। বায়তুলমালের সম্পদ অপচয় ও আত্মসাৎকরণ এবং শাসনকর্তাদের বিলাসপূর্ণ জীবন যাপন তাঁহার দৃষ্টিতে ছিল ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।
হযরত উসমান (রা) দেশের প্রশাসনযন্ত্র নিয়ন্ত্রন ও দোষত্রুটি সংশোধনের উদ্দেশ্যে একটি কেন্দ্রীয় ‘অনুসন্ধান কমিটি’ গঠন করিয়াছিলেন এবং রাজধানীর বাহিরে সর্বত্র উহাকে পাঠাইয়া দিতেন। কমিটি সমগ্র অঞ্চল ঘুরিয়া ঘুরিয়া প্রশাসন কর্মকর্তাদের কাজকর্ম ও জনগণের অবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করিত। এতদ্ব্যতীত দেশের সাধারণ অবস্থা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অবহিতি লাভের উদ্দেশ্যে হযরত উসমান (রা) জুম’আর দিন মিম্বারে দাঁড়াইয়া খুতবা শুরু করার পূর্বেই উপস্থিত জনতার নিকট দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পরিস্থিতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করিতেন। উপস্থিত লোকদের কথা তিনি বিশেষ মনোযোগ সহকারে শুনিতেন। উপরন্তু সমগ্র দেশবাসীর নিকট সাধারণভাবে ঘোষণা করিয়া দেওয়া হইয়াছিল যে, কোন প্রশাসকের বিরুদ্ধে কাহারো কোনোরূপ অভিযোগ থাকিলে হজ্জের সময় তাহা যেন খলীফার সম্মুখে পেশ করা হয়। কেননা এই সময় ইসলামী খিলাফতের সমস্ত দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে মক্কা শরীফে বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত থাকিতে হইত। এইভাবে লোকদের নিকট হইতে সামনা-সামনি অভিযোগ শ্রবণ ও উহার প্রতিকার সাধনের একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থা হযরত উসমান (রা)-এর আমলে কার্যকর ছিল।
উল্লেখ্য, সাধারণ প্রশাসন ও শাসন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থায় এবং বিভিন্ন শাসন বিভাগের হযরত উমর ফারুক (রা) প্রবর্তিত সংস্থাসমূহে হযরত উসমান (রা) কোনরূপ পরিবর্তন আনেন নাই। তিনি বরং উহাকেই অধিকতর সুসংবদ্ধ ও শক্তিশালী করিয়া তোলেন। ইহার পরিণতিতে রাজস্ব আদায়ে বিশেষ উন্নতি সাধিত হয়। ইহা ছাড়া নূতন অধিকৃত এলাকা হইতে রাজস্ব আদায়ের মাত্রা অনেক গুন বৃদ্ধি পায়। ফলে বায়তুলমালে ব্যয়ের খাত পূর্বাপেক্ষা অনেক বেশী সমৃদ্ধ হইয়া উঠে এবং বৃত্তি ও ভাতা হিসাবে বিপুল অর্থ জনসাধারণের মধ্যে বণ্টন করা হয়। হযরত উসমান (রা)-এর আমলে খিলাফতের পরিধি যতই সম্প্রসারিত হইয়াছে, উন্নয়ন ও পুননির্মাণের কাজ ততই ব্যাপকতা লাভ করিয়াছে। এই সময় প্রাদেশিক সরকারগুলিকে বিভিন্ন অফিসের জন্য বহুসংখ্যক ইমারত নির্মাণ করা হয়। ইহার পাশাপাশি সড়ক, পুল ও মসজিদ নির্মাণের কাজও ব্যাপকভাবে চলিতে থাকে। দূরগামী যাত্রীদের জন্য বহুসংখ্যক সাধারণ মুসাফিরখানা স্থাপন করা হয়।
রাজধানীতে যাতায়াতের সব কয়টি পথ অধিকতর সহজগম্য ও আরামদায়ক করিয়া তোলা প্রশাসন ব্যবস্থার সুষ্ঠুতা বিধান ও জনগণের চলাচল নির্বিঘ্ন করার জন্য একান্তই অপরিহার্য ছিল। হযরত উসমান (রা) ইহার জন্য যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ইহা ছাড়া তাঁহার উদ্যোগে মদীনা ও নজদের পথে পুলিশ-চৌকি স্থাপন করা হয় এবং মিষ্টি পানির জন্য কূপ খনন করা হয়। খায়বরের দিক হইতে কখনো কখনো বন্যার পানি আসিয়া মদীনাকে প্লাবিত ও নিমজ্জিত করিয়া দিত। ইহার ফলে শহরবাসীরা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইত। এমনকি মসজিদে নববীরও উহার দরুণ ধসিয়া পড়ার আশংকা দেখা দিয়াছিল। এই কারণে হযরত উসমান (রা) মদীনার অদূরে একটি বিরাট বাঁধ নির্মাণ করাইয়াছিলেন। সাধারণ জনকল্যাণের দৃষ্টিতে হযরত উসমান (রা) নির্মিত এই ‘মাহজুর’ বাঁধ তাঁহার একটি উল্লেখযোগ্য অবদান।
মসজিদে নববীর সম্প্রসারণ ও পুননির্মাণে হযরত উসমান (রা)-এর হস্তে খুবই প্রশস্ত এবং সুদক্ষ ছিল। নবী করীম (স)-এর সময় এই উদ্দেশ্যে সংলগ্ন ভূমি খরীদ করিয়া তিনি মসজিদের জন্য ওয়াকফ করিয়া দিয়াছিলেন, এতদ্ব্যতীত তাঁহার নিজের খিলাফত আমলেও এই কাজটি পুনর্বার সম্পাদিত হইয়াছে। এই সময় মসজিদ সম্প্রসারণের বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিয়াছিল;কিন্তু মসজিদ সন্নিহিত ঘর-বাড়ির মালিক ও অধিবাসীরা মসজিদের নৈকট্য হইতে বঞ্চিত হওয়ার আশংকায় ইহাতে কোনক্রমেই প্রস্তুত ছিলেন না। তাঁহাদিগকে বুঝাইয়া শুনাইয়া সম্মত করিবার জন্য হযরত উসমান (রা) অব্যাহতভাবে প্রচেষ্টা চালাইতে থাকেন। এইভাবে সুদীর্ঘ পাঁচটি বৎসর অতিবাহিত হইয়া যায়। কোনোরূপ বল প্রয়োগ বা প্রশাসন যন্ত্রের সাহায্যে জমি অধিগ্রহনের কাজ করিতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। ২৯ হিজরী সনে সাহাবীগণের সহিত এই বিষয়ে বিশেষভাবে পরামর্শ করা হয়। ইহার পরিপ্রেক্ষিত হযরত উসমান (রা) জুম’আর দিন অত্যন্ত সংবেদনশীল কণ্ঠে জনতার সম্মুখে ভাষণ পেশ করেন। ভাষণে তিনি নামাজীদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও মসজিদের সংকীর্ণতা জনিত সমস্যা বিশেষভাবে বুঝাইয়া বলেন। ভাষণ শ্রবণের পর লোকেরা সানন্দ চিত্তে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের ঘরবাড়ী ছাড়িয়া দিতে প্রস্তুত হন।
হযরত উমর ফারুক (রা) সামরিক বিভাগের জন্য যে ব্যবস্থাপনা করিয়া গিয়াছিলেন, হযরত উসমান (রা) উহাকে আরও উন্নত ও সম্প্রসারিত করেন। সামরিক বিভাগকে তিনিই সর্বপ্রথম প্রশাসন বিভাগ হইতে বিচ্ছিন্ন ও স্বতন্ত্র করিয়া গড়িয়া তোলেন। তাঁহার উদ্যোগে প্রতিটি কেন্দ্রীয় স্থানে সেনা সংস্থাকে একজন বিশেষ সামরিক কর্মকর্তার অধীনে ন্যস্ত করিয়া দেওয়া হয়। ফলে দূরবর্তী যে কোন স্থানে সামরিক বাহিনী প্রেরণের প্রয়োজন অত্যন্ত তড়িৎবেগে পূরণ করার সুষ্ঠু ব্যবস্থা গৃহীত হয়। এই সময় ত্রিপলি, সাইপ্রাস, তিবরিস্তান ও আর্মেনিয়া অঞ্চলেও সামরিক ঘাঁটি সংস্থাপন করা হয়।
হযরত উসমান (রা)-এর খিলাফত আমলে ঘোড়া এবং উহার উষ্ট্র পালন এবং উহার সংরক্ষণের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপিত হয়। এই উদ্দেশ্যে সমগ্র শাসনাধীন অঞ্চলে বিশাল চারণ ভূমি গড়িয়া তোলা হয়। রাজধানীর আশেপাশেও অসংখ্য চারণ ভূমি তৈয়ার করা হয় এবং চারণ ভূমির নিকটেই পানির ব্যবস্থা করা হয়।
দ্বীন-প্রচারের কাজ
খলীফা মূলত নবী করীম (স)-এর উত্তরাধিকারী, স্থলাভিষিক্ত এবং যাবতীয় সামষ্টিক দায়িত্ব পালনের জন্য দায়িত্বশীল। তাঁহার বড় কর্তব্য হইল দ্বীনের যথাযথ খেদমত এবং উহার ব্যাপক প্রচার সাধন। হযরত উসমান (রা) এই দায়িত্ব পালনে সদা-সচেতন ও বিশেষ কর্তব্যপরায়ণ হইয়া থাকিতেন। প্রত্যক্ষ জিহাদে যে সব অমুসলিম বন্দী হইয়া আসিত, তাহাদের সম্মুখে তিনি নিজে দ্বীনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও উহার সৌন্দর্য প্রকাশ করিতেন এবং দ্বীন-ইসলাম কবুল করার জন্য তাহাদিগকে আহ্বান জানাইতেন। ইহার ফলে শত শত লোক ইসলাম গ্রহণ করিয়া মুসলিম সমাজের অন্তর্ভুক্ত হইবার বিপুল সুযোগ লাভ করে।
বিধর্মীদের নিকট ইসলাম প্রচার ছাড়াও স্বয়ং মুসলিম জনগণের ধর্মীয় শিক্ষা-দীক্ষার জন্যও তিনি ব্যাপক ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছিলেন। দ্বীন সংক্রান্ত জরুরী মসলা-মাসায়েল তিনি নিজেই জনগণকে জানাইয়া দিতেন। কোন বিষয়ে দ্বীনের হুকুম তাঁহার নিকট অস্পষ্ট থাকিলে অন্যান্য বিশেষজ্ঞ সাহাবীদের নিকট তিনি জিজ্ঞাসা করিয়া লইতেন ও তদনুযায়ী আমল করিতেন এবং লোকদিগকেও তাহা অনুসরণ করিয়া চলিবার জন্য নির্দেশ দিতেন। এই ব্যপারে তিনি কোনোরূপ দ্বিধা-সংকোচের প্রশ্রয় দিতেন না।
প্রয়োজনে তাগিদে ইসলামের মূল বিধানের উপর নির্ভর করিয়া নবতর ব্যবস্থা প্রবর্তন করিতেও হযরত উসমান(রা) দ্বিধা করিতেন না। মদীনার লোকসংখ্যা যখন বিপুলভাবে বৃদ্ধি পাইল, তখন মসজিদের অভ্যন্তরে ইমামের সম্মুখে জুম’আর নামাযের একটি মাত্র আযানই যথেষ্ট মনে হইল না। এই কারণে তিনি উহার পূর্বে এক উচ্চস্থানে দাঁড়াইয়া জুমায়ার আর একটি আযান দেওয়ার ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন।
এই পর্যায়ে হযরত উসমান (রা)-এর বড় অবদান হইল কুরআন মজীদকে সর্বপ্রকার মতবিরোধ ও বিকৃতি হইতে চিরকালের জন্য সুরক্ষিত করিয়া তোলার এক অতুলনীয় কার্যক্রম। আর্মেনিয়া ও আযারবাইজান অভিযানে মিশর, সিরিয়া, ইরাক প্রভৃতি অঞ্চলের মুজাহিদগণ একত্রিত হইয়াছিলেন। ইহাদের মধ্যে অধিকাংশই নও-মুসলিম, অনারব বংশোদ্ভুত এবং আরবী ভাষায় অনভিজ্ঞ ছিলেন। হযরত হুজাইফা ইবনে ইয়ামান (রা)-ও এই জিহাদে শরীক ছিলেন। তিনি নিজে এই দুই জিহাদে অংশ গ্রহণকারী মুসলিম মুজাহিদদের কুরআন পাঠের ধরণ ও ভঙ্গিতে মারাত্মক রকমের পার্থক্য ও বৈষম্য লক্ষ্য করিলেন। দেখা গেল, প্রত্যেক এলাকার লোকেরা নিজস্ব ইচ্ছানুসারে কুরআন পড়ে এবং উহাকেই কুরআন পড়ার একমাত্র ধরণ ও ভঙ্গী মনে করিয়া লইয়াছে। যুদ্ধ শেষে তিনি মদীনার উপস্থিত হইয়া খলীফা হযরত উসমান (রা)-এর নিকট সমস্ত ব্যাপার বিস্তারিতভাবে পেশ করিলেন। তিনি গভীর আশংকা প্রকাশ করিয়া বলিলেন, অনতিবিলম্বে এই বিরোধ ও পার্থক্য সম্পূর্ণ দূরীভূত করিয়া এক অভিন্ন ধরণ ও ভঙ্গীতে কুরআন পাঠের ব্যবস্থা করা না হইলে মুসলিম সমাজও খৃস্টান রোমানদের ন্যায় আল্লাহ্‌র কিতাবের ব্যাপারে নানা বিভেদ ও বিসম্বাদের সৃষ্টি করিয়া ছাড়িবে। হযরত হুযাইফা(রা)-এর দৃষ্টি আকর্ষণে হযরত উসমান (রা) ইহার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে বুঝিতে পারিলেন। তিনি উম্মুল মু’মিনীন হযরত হাফসা (রা)-এর নিকট হইতে কুরআন মজীদের মূল গ্রন্থ আনাইয়া হযরত জায়েদ ইবনে সাবিত (রা), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা) ও হযরত সায়াদ ইবনুল আ’স(রা) কর্তৃক উহার বহু সংখ্যক কপি তৈয়ার করাইয়া বিভিন্ন মুসলিম অঞ্চলে পাঠাইয়া দিলেন এবং উহাকেই কুরআন মজীদের চূরান্তরুপ হিসাবে গ্রহণ ও অনুসরণ করার জন্য সর্বসাধারণকে নির্দেশ দিলেন। সেই সঙ্গে লোকদের ব্যক্তিগতভাবে লিখিয়া লওয়া কুরআনের সব কপি তিনি নিশ্চিহ্ন করিয়া ফেলিলেন।
বস্ততঃ হযরত উসমান (রা) যদি এই পদক্ষেপ গ্রহণ না করিতেন, তাহা হইলে তওরাত, ইনজিল ও অন্যান্য আসমানী গ্রন্থের ব্যাপারে উহাদের প্রতি বিশ্বাসী লোকেরা যে মারাত্মক ধরণের মতভেদ ও বৈষম্যে নিমজ্জিত হইয়াছে, শেষ নবীর উম্মতরাও অনুরূপ বিভেদ ও বৈষম্যে পড়িয়া যাইত এবং কুরআন মজীদেরও অনুরূপ দুর্দশা ঘটিত, ইহাতে একবিন্দু সন্দেহের অবকাশ নাই। তাই ইসলামের ইতিহাসে হযরত উসমান (রা)-এর এই মহান কীর্তি চিরকাল স্বর্ণক্ষরে লিখিত থাকিবে

 

হজরত উসমান রা.-এর সময়ের হাতে লেখা কোরআন জাতীয় জাদুঘরে

ইসলাম ডেস্ক বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৭-০৫-১৮ ৮:৩৮:০৬ এএম
  
বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘরে মূল্যবান নিদর্শনের তালিকায় এবার যোগ হলো- হজরত উসমান (রা.)-এর সময়ের হাতে লেখা পবিত্র কোরআন
বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘরে মূল্যবান নিদর্শনের তালিকায় এবার যোগ হলো- হজরত উসমান (রা.)-এর সময়ের হাতে লেখা পবিত্র কোরআন
বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘরে মূল্যবান নিদর্শনের তালিকায় এবার যোগ হলো- হজরত উসমান (রা.)-এর সময়ের হাতে লেখা পবিত্র কোরআন ‘মাসহাফে উসমানি’র একটি ছায়ালিপি।
ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত উসমানের আমলের এই কোরআন শরিফের মূল্যবান কপিটি এত দিন সংরক্ষণ করা হয়েছিল ইসলামিক ফাউন্ডেশনের লাইব্রেরিতে। 
১৫ মে চামড়ায় হাতে লেখা পবিত্র কোরআনের এই ছায়ালিপিটি সংগ্রহ করা হয়েছে। বিশ্বে এ ধরনের কোরআনের ৫টি কপি রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্বে এ ধরনের কোরআনের ৫টি কপি রয়েছে বলে জানা গেছে
বৃহস্পতিবার (১৮ মে) দুপুরে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে কোরআন শরিফটি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জাতীয় জাদুঘরকে দেওয়া হয়। 
এখন এটি জাতীয় জাদুঘরে করিডরে বিশেষ ব্যবস্থায় প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে।
জাদুঘর সূত্রে জানা হেছে, আজ থেকে রমজান মাসজুড়ে কোরআনটি জাদুঘরের লবিতে বিশেষ ব্যবস্থায় প্রদর্শন করা হবে। পরে এটি মূল গ্যালারিতে নেওয়া হবে।
কোরআনটির দৈর্ঘ্য ১০ ইঞ্চি। প্রস্থ ১ ফুট। উচ্চতা ৩ ইঞ্চি। ওজন সাড়ে ৭ কেজি। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩৭২। 
এখন এটি জাতীয় জাদুঘরে করিডরে বিশেষ ব্যবস্থায় প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে
উল্লেখ্য যে, ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান (রা.)-এর শাসনামলে বহু দূর-দূরান্তে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে গিয়েছিল। লোকেরা দলে দলে ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেই কোরআনের শিক্ষা ও চর্চায় তৎপর হয়ে পড়েন। 
কিন্তু অধিকাংশ নওমুসলিম ছিল অনারবি। তারা কোরআন সুস্পষ্টভাবে তেলাওয়াত করতে পারত না এবং অনেক আরবিও নিজ নিজ আঞ্চলিক ভাষায় কোরআন তেলাওয়াত করত; অথচ কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে কোরাইশি ভাষায়। হজরত উসমান (রা.) দেখলেন, বিভিন্ন ভাষার কোরআন পড়ার দরুন উম্মতের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি হচ্ছে। তাই তিনি সাহাবিদের পরামর্শক্রমে সব পাণ্ডুলিপি একত্রিত করে কোরাইশি লুগাতের (ভাষা) পাণ্ডুলিপি ছাড়া বাদবাকি পাণ্ডুলিপি নিষিদ্ধ করেন এবং প্রচলিত ‘মাসহাফে উম’ থেকে কপি করে বড় বড় মুসলিম শহরে পৌঁছে দেন।
এ জন্য হজরত উসমানকে জমিউল কোরআন (কোরআন একত্রকারী) বলা হয়। এই নতুন সংকলনের নামকরণ করা হয়- ‘মাসহাফে উসমানি।’হযরত ওসমান (রাঃ) এর শাহাদাত ও শাহাদাতের ফলাফল


আল্লাহর রসূল (সা) হযরত ওসমান (রা) সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেনসাধারণ মুসলমানগণ বিদ্রোহীদের ধ্বংসাত্মক অভিযানে মধ্যে অশ্রু নয়নে তাই দেখতেছিলেন। একমাত্র হযরত ওসমানই নির্বিকার চিত্তে আল্লাহর রাসূলের অন্তিম বাণীর বাস্তবতা অবলোকন করার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। জুমার দিন সুর্যোদয়ের পূর্বেই তিনি রোজার নিয়ত করলেন। এই দিন তিনি সকালের দিকে স্বপ্ন দেখলেনআল্লাহর রাসূল (সা) হযরত আবু বকর সিদ্দিক ও হযরত ওমর সমভিব্যহারে তাশরীফ এনে বলতেছেন- ওসমান (রা) শীঘ্র চলে আস। আমি এখানে তোমার ইফতারের অপেক্ষায় বসে আছি। চক্ষু খোলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিবিকে ডেকে বললেন,আমার শাহাদাতের সময় নিকটবর্তী হয়েছে। বিদ্রোহীরা এখনই আমাকে হত্যা করে ফেলবে। বিবি বলিলেন,- নানাএইরূপ কিছুতেই হতে পারে না। তিনি বলিলেনআমি এখনই স্বপ্নে দেখেছি। এই কথার পর বিছানা হতে উঠে একটি নূতন পাজামা পরিধান করলেন এবং কোরআন সম্মুখে নিয়ে তেলাওয়াতে বসে গেলেন।
ঐদিকে সেই সময় মোহাম্মদ ইবনে আবু বকর তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করলেন। একটি তীর এসে খলিফার দ্বারে দণ্ডায়মান হযরত হোসাইনের শরীরে বিদ্ধ হল। হযরত হোসাইন (রা) গুরুতররূপে আহত হলেন। আর একটি তীর গৃহের অভ্যন্তরে মারওয়ানেরশরীরে গিয়ে লাগল। হযরত আলীর গোলাম কাম্বরও মাথায় আঘাত প্রাপ্ত হন। হযরত হোসাইনকে আহত হতে দেখে মোহাম্মদ ইবনে আবু বকর ভীত হয়ে উঠেন। তিনি স্বীয় দুই সঙ্গীকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন- বনী হাশেম যদি হযরত হোসাইনের আহত হওয়ার খবর পায়তবে আমাদের সমগ্র পরিকল্পনা বানচাল হয়ে যাবে। তারা হযরত ওসমানের কথা ভুলে হযরত হোসাইনের রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ না করে ছাড়বে না। সুতরাং এই মুহূর্তে কার্য উদ্ধার করে ফেলা উচিত। মোহাম্মদ ইবনে আবু বকরের এই পরামর্শ মত সঙ্গে সঙ্গেই কয়েকজন বিদ্রোহী দেওয়াল টপকিয়ে গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল। ঘটনাচক্রে খলিফার ঘরে তখন যে কয়জন মুসলমান উপস্থিত ছিলেনসকলেই উপরে বসে অপেক্ষারত ছিলেন। হযরত ওসমান (রা) তখন একাকী নীচে বসে কোরআন তেলাওয়া্তে মশগুল ছিলেন। বিদ্রোহীদের সাথে গৃহে প্রবেশ করতঃ মোহাম্মদ ইবনে আবু বকর অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যবহার করলেন। তিনি হযরত ওসমানের পবিত্র দাড়ি আকর্ষণ করিয়া তাকে সজোরে মাটিতে ফেলে দিলেন। আমীরুল মোমেনীন ওসমান (রা) তখন বলতে লাগলেন- ভ্রাতুষ্পুত্রআজ হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) জীবিত থাকলে এই দৃশ্য কিছুতেই পছন্দ করতেন না। এই কথা শুনে মোহাম্মদ ইবনে আবু বকর অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে পিচু হটে গেলেনকিন্তু কেননা ইবনে বেশর একটি লোহার শলাকা দিয়া খলিফার মস্তকদেশে এক নিদারুণ আঘাত হানল। আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর রসূলের এই সম্মানিত প্রতিভূ বিছানায় গড়িয়ে পড়লেন এবং বলতে লাগলেনঃ বিসমিল্লাহআল্লাহর উপর ভরসা করিতেছি। দ্বিতীয় আঘাত করল সাওদান ইবনে আমরান। দ্বিতীয় আঘাতে রক্তের ফোয়ারা বহিয়া চলল। আমর ইবনে হোমকের নিকট এই নৃশংসতা যথেষ্ট মনে হল না। হতভাগ্য নায়েবে রাসূলের বুকের উপর আরোহণ করতঃ খড়গ দ্বারা আঘাতের পর আঘাত করতে শুরু করল। এই সময় অন্য এক নির্দয় তরবারি দ্বারা আঘাত করল। এই আঘাতের সময় বিবি হযরত নায়েলা দৌড়িয়ে ওসমান (রাঃ) কে দরতে গেলে তার তিনটি আঙ্গুল কেটে মাটিতে পড়ে গেল। এই ধস্তাধস্তির মধ্যেই আমীরুল মোমেনীনের পবিত্র আত্মা জড়দেহ ছেড়ে অনস্ত শূন্যে মিলিয়ে গেল। ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন।
নৃশংসতার এই পাশবিক দৃশ্য কেবলমাত্র হযরত নায়েলা সচক্ষে দর্শন করলেন। তিনি হযরত ওসমানকে নিহত হতে দেখে ঘরের ছাদে আরোহণ করতঃ চিৎকার করিয়া বলতে লাগলেনআমীরুল মোমেনীন শহীদ হয়ে গিয়েছেন। খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমীরুল মোমেনীনের বন্ধুরা ছুটে এসে দেখলেনহযরত ওসমানের রক্তাক্ত দেহ বিছানায় পড়ে রয়েছে। এই খবর প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মদীনাবাসীগণ ঊর্ধ্বশ্বাসে খলিফার গৃহের দিকে ছুটে আসলেনকিন্তু তখন সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। হযরত আলী (রা) কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে হযরত হাসান ও হোসাইনকে শাসন করতে লাগলেনকিন্তু সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। হযরত ওসমান (রা) রক্তের ফোয়ারায় ডুবে গৃহের অভ্যন্তরে পড়েছিলেনকিন্তু তখনও অবরোধ ঠিকমত চলছিল। দীর্ঘ দুই দিন পর্যন্ত খলিফাতুল মুসলেমনীনের পবিত্র লাশ গোর-কাফন ব্যতীত গৃহে পড়ে থাকে। তৃতীয় দিন কতিপয় ভাগ্যবান মুসলমান এই শহীদের রক্তাক্ত লাশ দাফন-কাফনের জন্য  এগিয়ে আসলেন। মাত্র সতের জন লোক জানাযার নামায পড়লেন। এইভাবে আল্লাহর কিতাবের সর্বশ্রেষ্ঠ সেবকসুন্নতে রাসূলের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেমিককে জান্নাতুল বাকীতে নিয়ে সমাহিত করা হয়
দুর্ঘটনার সময় ওসমান (রা) কোরআন তেলাওয়াত করতেছিলেন। তাঁহার সম্মুখে পবিত্র কোরআন খোলা অবস্থায় পড়েছিল। হযরত ওসমানের পবিত্র রক্ত কোরআন পাকের নিম্নলিখিত আয়াতখানা রঞ্জিত করে দিয়েছিলঃ
فسيقفيك الله - انه هو السميع العليمআল্লাহই তোমার জন্য যথেষ্ট। তিনি প্রাজ্ঞ. তিনি সব শোনেন।
জুমার দিন আছরের সময় তিনি শহীদ হলেন। হযরত জুবাইর ইবনে মোত্য়েম জানাযার নামায পড়ালেন। হযরত আলী (রা) দুই হাত ঊর্ধ্বে তুলে বলতে লাগলেনআমি ওসমানের রক্তপাত হতে সম্পূর্ণ নির্দোষ! সায়ীদ ইবনে যায়েদ (রা) বললেনতোমাদের ধৃষ্টতার প্রতিফলস্বরূপ ওহুদ পর্বত ফেটে পড়ার কথা। হযরত আনাস (রা) বললেনহযরত ওসমানের জীবদ্দশা পর্যন্ত আল্লাহর তরবারি কোষবদ্ধ ছিল। তার শাহাদাতের পর অদ্য এই তরবারি কোষমুক্ত হবে এবং কেয়ামত পর্যন্ত উহা কোষমুক্তই থাকবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেনযদি হযরত ওসমানের রক্তের প্রতিশোধ দাবী করা না হত তবে মানুষের উপর আকাশ হতে প্রস্তর বর্ষিত হত হযরত সামুর (রা) বলেনহযরত ওসমান(রাঃ)-হত্যার জের কেয়ামত পর্যন্ত বন্ধ হবে না এবং ইসলামী খেলাফত মদীনা হতে এমনভাবে বহিস্কৃত হবেযা কেয়ামত পর্যন্ত আর কখনও মদীনায় ফিরে আসবে না।
কাব ইবনে মালেক (রা) শাহাদাতের খবর শুনলেনসঙ্গে সঙ্গে তার মুখ হতে কয়েকটি কবিতা বের হয়ে আসল। যার মর্ম হল-
তিনি তার উভয় হস্ত বেধেঁ রাখলেনগৃহের দরজাও বন্ধ করে দিলেন। মনে মনে বললেনআল্লাহ সব কিছুই জানেন। তিনি তার সঙ্গীদিগকে বললেনশত্রুদের সহিত যুদ্ধ করিও না। আজ যে ব্যক্তি আমার জন্য যুদ্ধ না করবেসে আল্লাহর শান্তির ছায়ায় থাকিবে।
ওহে দর্শকগণ! হযরত ওসমানে শাহাদাতের ফলে পরস্পরের ভালবাসা কেমন করে নষ্ট হয়ে গেল। আর আল্লাহ তার জায়গায় পরস্পরের উপর শত্রুতার বোঝা চাপিয়ে দিলেন।
হায়! ওসমানের পর মঙ্গল এমনভাবে অন্তর্হিত হবেযেমন তীব্র ঘূর্ণিবাত্যা এসে সঙ্গে সঙ্গে অনর্হিত হয়ে যায়।
ওসমান (রাঃহত্যার ফলাফলঃ
হযরত ওসমানের শাহাদাতের খবর মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র মুসলিম জাহানে ছড়িয়ে পড়ল। এই সময় হযরত হোযাইফা (রা) বলেন,পরবর্তী সমস্ত ঘটনাই তাঁর সেই কথার ব্যাখ্যা প্রদান করেছে। তিনি বলেছিলেনহযরত ওসমানের শাহাদাতের ফলে মুসলিম জাহানে এমন এক বিপর্যয় নেমে এসেছেকেয়ামত পর্যন্তহ যা রুদ্ধ হওয়ার নহে।
হযরত ওসমানের রক্তাক্ত জামা ও হযরত নায়েলার কাটা আঙ্গুলি বনী উমাইয়ার তদানীন্তন বিশিষ্ট নেতাসিরিয়ার শাসনকর্তা হযরত আমির মোয়াবিয়ার নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হল। খলিফাতুল মুসলেমীনের এই রক্তাক্ত জামা যখন সিরিয়ায় গভর্নর হাউজে খোলা হয়,তখন চারিদিক হইতে কেবল প্রতিশোধ প্রতিশোধ আওয়াজ উঠল। বনী উমাইয়ার বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ সকলে আমির মোয়াবিয়ার নিকট সমবেত হলেন। এখানে এ কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্যহযরত আলীর খেলাফত হতে শুরু করে ইমাম হোসাইনের শাহাদাত এবং আমির মোয়াবিয়ার পর উমাইয়া ও আব্বাসিয়া খেলাফতের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যতগুলি দুর্ঘটনার সৃষ্টি হয়েছেপ্রত্যেকটি স্থানেই হযরত ওসমানের পবিত্র রক্ত ক্রিয়াশীল দেখতে পাওয়া যায়। হযরত ওসমানের এই শাহাদাত এমন একটি দুর্ঘটনাযদ্দ্বারা ইসলামের ভাগ্যই পরিবর্তিত হয়ে গেল। জঙ্গে জামালে যাহা কিছু হইয়াছেতাহাও এই রক্তের জের মাত্র।সিফফিনে যাহা হয়েছে তা এই ঘটনারই ফল। তৎপর কারবালাতে যাহা কিছু অনুষ্ঠিত হইয়েছে তাও এই ঘটনারই দুঃখজন পরিণতি। তৎপর উমাইয়া বনাম আব্বাসিয়া প্রশ্নে যে সমস্ত দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছেতাও এই বিভ্রান্তি বা বেদনাদায়ক অপকর্মেরই স্বাভাবিক পরিণতি মাত্র। হযরত ওসমানের শাহাদাতের পর বনী উমাইয়া ও বনী হাশেমের গোত্রীয় বিদ্বেষের আগুন আবার নূতনভাবে জ্বলে উঠল এবং ইসলামের যে বিদ্যুতসম শক্তি একদা সমগ্র দুনিয়ার শান্তির সমৃদ্ধির শপথ নিয়ে অগ্রসর হয়েছিলতাহা এমনভাবে বিপর্যস্ত হল যেঅতঃপর আর কখনও সেইবিপর্যয় সামলিয়ে উঠা সম্ভবপর হয়নি।
  

Comments

Popular posts from this blog

শরিয়ত,তরিকত,হাকিকত ও মারফত কাকে বলে? বিস্তারিত?

হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-বড় পীর এর জীবনী